সমালোচনা বনাম গালিগালাজ : সীমারেখা কোথায়

প্রতীকী ছবি
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নির্ভর একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি— যেখানে ভিন্নমতকে সম্মান করা, যুক্তির মাধ্যমে বিরোধিতা করা এবং প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা, শত্রু হিসেবে নয়। Alexis de Tocqueville তার বিখ্যাত গ্রন্থ Democracy in America-এ দেখিয়েছিলেন, গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নয়, বরং নাগরিক আচরণ ও সামাজিক সংস্কৃতির ওপর। একইভাবে Robert A. Dahl তার On Democracy গ্রন্থে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান ও যুক্তিনির্ভর আলোচনাকে গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ভাষার শালীনতা কেবল ‘ভদ্রতার অলংকার’ নয়; এটি গণতন্ত্রের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশে—যেমন যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র—গণতন্ত্র শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক আচরণ ও ভাষার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। এসব দেশে সংসদীয় বিতর্কের একটি স্বতন্ত্র নীতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে সদস্যরা সরাসরি ব্যক্তিগত সম্বোধন এড়িয়ে ‘the Honourable Member’ বলে একে অপরকে উল্লেখ করেন—এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রাজনৈতিক শালীনতার প্রতীক।
প্রধানমন্ত্রীর কাজ, নীতি বা সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর রাজনৈতিক সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু ব্যক্তিগত গালিগালাজ বা অবমাননাকর ভাষা কি কখনো রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে?
কানাডা ও জার্মানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়: তীব্র মতবিরোধ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে নীতিগত সমালোচনাই প্রধান হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচারণায় ভাষা অনেক সময় তীক্ষ্ণ হলেও প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চে একটি সীমারেখা বজায় রাখার প্রচেষ্টা স্পষ্ট।
এই সংস্কৃতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক চর্চা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর জবাবদিহিতা, এবং নাগরিক শিক্ষার বিস্তার। Chantal Mouffe তার The Democratic Paradox গ্রন্থে দেখিয়েছেন, গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে ‘adversary’ হিসেবে দেখা উচিত—যার সঙ্গে মতভেদ থাকবে, কিন্তু যার বৈধতাকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু যখন প্রতিপক্ষকে ‘enemy’ হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন রাজনৈতিক ভাষাও স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণাত্মক ও অশালীন হয়ে ওঠে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই চিত্রের অনেকটাই বিপরীত। এখানে রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমশ ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি এবং অবমাননাকর ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে টেলিভিশন টকশো, এমনকি সংসদীয় আলোচনাতেও শালীনতার সীমা প্রায়ই লঙ্ঘিত হয়। প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে তাকে হেয় করা যেন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এর একটি স্পষ্ট উদাহরণও দেখা গেছে—কয়েকজন নবাগত রাজনৈতিক নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন ও অরুচিকর বক্তব্য দিয়েছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর কাজ, নীতি বা সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর রাজনৈতিক সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু ব্যক্তিগত গালিগালাজ বা অবমাননাকর ভাষা কি কখনো রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে? তিনি যে-ই হোন না কেন, তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী— এবং সেই পদটির প্রতি একটা ন্যূনতম সম্মান বজায় রাখা কি আমাদের দায়িত্ব নয়? এই ধরনের আচরণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী শিখবে—এ প্রশ্নটিও তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই প্রবণতা কেবল দৃষ্টিকটু নয়; এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, রাজনৈতিক নেতাদের ভাষাই শেষ পর্যন্ত সমাজের ভাষায় পরিণত হয়। যখন জনসম্মুখে নেতারা একে অপরকে অসম্মান করেন, তখন সাধারণ মানুষও সেই আচরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। ফলে সমাজে সহনশীলতা কমে যায়, বিভাজন বাড়ে এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে এই অবক্ষয়ের পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সংসদ, বিচারব্যবস্থা কিংবা নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন যথেষ্ট শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তখন রাজনৈতিক আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে Francis Fukuyama তার Political Order and Political Decay গ্রন্থে দেখিয়েছেন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে নীতি নির্ভরতার বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সংঘাতমুখী করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, তীব্র রাজনৈতিক মেরূকরণ। এখানে রাজনীতি অনেকাংশে ‘জিততেই হবে’—এই মানসিকতায় পরিচালিত হয়, যেখানে প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দেখা হয় শত্রু হিসেবে। এই মনোভাব ভাষার আক্রমণাত্মক ব্যবহারকে উসকে দেয়। তৃতীয়ত, জবাবদিহিতার অভাব। শালীনতা ভঙ্গের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় কোনো মূল্য দিতে না হলে এই প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
চতুর্থত, নাগরিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। গণতান্ত্রিক আচরণ, বিতর্কের সংস্কৃতি এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার চর্চা সমাজে যথেষ্টভাবে প্রাতিষ্ঠানিক হয়নি। পাশাপাশি Steven Levitsky এবং Daniel Ziblatt তাদের How Democracies Die গ্রন্থে দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়—যখন পারস্পরিক সহনশীলতা ও নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে, যার একটি স্পষ্ট লক্ষণ হলো রাজনৈতিক ভাষার অবক্ষয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ অবশ্যই রয়েছে, তবে তা সহজ নয়। প্রথমত, সংসদীয় আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে ভাষা ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে—অশালীন বক্তব্যকে প্রচার না করে বরং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এবং সর্বোপরি, জনগণের মধ্যেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে—কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত ধারক ও বাহক তারাই।
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটে নয়; এটি প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক আচরণে, ভাষায় এবং সংস্কৃতিতে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে যে শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা দেখি, তা কোনো আদর্শিক কল্পনা নয়—বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি বাস্তবতা।
বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা অর্জন করা অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, এবং একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা। অন্যথায়, আমরা হয়তো গণতন্ত্রের কাঠামো ধরে রাখব, কিন্তু তার আত্মা হারিয়ে ফেলব—আর সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

