ফ্রিজ ভরে, মন ভরে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছেলেবেলায় ঈদুল আজহার সকালটা ছিল অন্যরকম। গ্রামের বাড়িতে ভোর থেকেই একটা উত্তেজনা টের পাওয়া যেত। উঠোনে বাঁধা গরু বা ছাগলটার দিকে বড়রা যখন এগিয়ে যেতেন, আমরা ছোটরা দূরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ভয়ে আর কৌতূহলে মেশানো এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। কোরবানি শেষ হলে শুরু হতো আরেক আনুষ্ঠানিকতা। মাংস ভাগ হতো মেপে মেপে। পাড়ার গরিব মানুষগুলো আসত, আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠানো হতো, দূরের প্রতিবেশীদেরও মনে রাখা হতো। এই ভাগাভাগিতে একটা উৎসবের পরিপূর্ণতা ছিল, একটা তৃপ্তি ছিল।
সেই দৃশ্য এখন স্মৃতির পাতায় বন্দি।
ঢাকা শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতে কোরবানির চেহারাটা আজ অনেকটাই বদলে গেছে। পশু কেনা হয়, কসাই আসে, মাংস প্রস্তুত হয় এবং সিংহভাগ গিয়ে ঠাঁই নেয় রেফ্রিজারেটরের ভেতরে। বাড়ির কাজের মানুষটিকে হয়তো কেউ কেউ কিছু দেন, দারোয়ানকেও দু-চার পিস দেওয়া হয়। কিন্তু দরজায় এসে দাঁড়ানো গরিব মানুষটিকে অনেক ক্ষেত্রে ভবনের নিচতলা থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়, ওপরে উঠতে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এই পরিবর্তন শুধু আচার-অভ্যাসের নয়, এটা মূল্যবোধেরও।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। এটি নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। এর মধ্যে রয়েছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা, লোভ ও অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রেরণা। ইসলামি পণ্ডিতরা যুগে যুগে বলে এসেছেন, কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানিদাতার মনের ভেতরের কার্পণ্য ও অহমিকাও ঝরে পড়ার কথা। কিন্তু সেই পশুর মাংস যদি শুধু নিজের ঘরেই আটকে থাকে, তাহলে ইবাদতের সেই গভীর তাৎপর্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
কোরবানির মাংস বণ্টনের যে বিধান, সেটি একটি সুচিন্তিত সামাজিক দর্শনের প্রকাশ। গরিব ও আত্মীয়দের মধ্যে মাংস বিতরণ না করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কাজ বলে বিবেচিত। কারণ কোরবানির একটি বড় উদ্দেশ্য হলো সমাজের যে মানুষগুলো সারা বছর মাংসের মুখ দেখতে পান না, তাদের আমিষের চাহিদা পূরণ করা। শহরে বসে যারা মাসে মাসে রেস্তোরাঁয় যান, সেই অভিজ্ঞতা তাদের কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু দেশের বহু পরিবারে বছরে একবারও মাংস রান্না হয় না। সেই বাস্তবতা থেকে চোখ সরিয়ে রাখলে কোরবানির অর্থ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করা কোরবানির আরেকটি অন্তর্নিহিত লক্ষ্য। দূরের আত্মীয়ের বাড়িতে মাংস পাঠানো, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, এই আচরণগুলো শুধু ধর্মীয় কর্তব্য নয়, এগুলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের সুতো। শহরের ব্যস্ত জীবনে সেই সুতোগুলো ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী কে, তা জানার সময় নেই। আত্মীয়কে মনে রাখার ফুরসত নেই। কোরবানির মাংস কার ঘরে পৌঁছাবে সেই চিন্তা তো আরও দূরের বিষয়।
তবু প্রশ্ন জাগে, এই ফিরে যাওয়া কি একেবারেই অসম্ভব? শহরের সীমাবদ্ধতা আছে, ফ্ল্যাটের পরিসর ছোট, চেনা মানুষের গণ্ডি সংকুচিত। কিন্তু মসজিদের মাধ্যমে বিতরণ করা যায়, এলাকার পথশিশুদের কাছে পৌঁছানো যায়, বস্তিতে পাঠানো যায়। ইচ্ছে থাকলে পথ বের হয়।
কোরবানির পশু জবাই হয়, কিন্তু সেই জবাইয়ের মধ্য দিয়ে যে উদারতার জন্ম হওয়ার কথা ছিল, সেটা যেন কোথাও আটকে যাচ্ছে ফ্রিজের দরজায়। ফ্রিজ ভরে, কিন্তু মন ভরে কি? আর মন না ভরলে কোরবানির পূর্ণতা আসে কীভাবে?






