সাক্ষাৎকার
‘পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি করা সঠিক ছিল না’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনতার রুদ্ররোষের শিকার হয় পুলিশ। প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে চলে যান শীর্ষ কর্মকর্তাসহ প্রায় সব পুলিশ সদস্য। ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের নেটওয়ার্ক ভেঙে যায়। টালমাটাল পরিস্থিতিতে সাহস করে একজন মাত্র উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা তখন সামনে আসেন। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন ডিআইজি (টেলিকম) একেএম শহিদুর রহমান। ডিআইজি পদে থাকলেও ছিলেন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক। গত ১৬ মার্চ তিনি যান অবসরে। সেদিনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে যাওয়া পুলিশ বাহিনীকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা নিয়ে একেএম শহিদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়
আগামীর সময়: ৫ আগস্ট সরকারের পতন এবং সেসময়ের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের ঘোষণা এলো। এরপর পুলিশের ভেতরকার পরিস্থিতি কেমন ছিল?
একেএম শহিদুর রহমান: সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। পুলিশ সদস্যরা যে যেভাবে পারছেন প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। শীর্ষ কর্মকর্তাদের কোনো কমান্ড নেই। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো পরিস্থিতি নেই। হতবিহ্বল সবাই। সন্ধ্যার আগমুহূর্তে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ সার্ভিসে কর্মরত একজন অ্যাডিশনাল ডিআইজি আমাকে ফোন করে বললেন, দলে দলে মানুষ হেডকোয়ার্টারে আক্রমণের জন্য ছুটে আসছে। আমি বললাম, ‘সব বন্ধ করে দিয়ে চলে যাও। আগে নিজের জীবন বাঁচাও।’
আগামীর সময়: আপনি কোথায় ছিলেন?
একেএম শহিদুর রহমান : আমি আমার সরকারি কোয়ার্টারে ছিলাম। রাতটাও কোয়ার্টারেই পার করলাম।
আগামীর সময়: রাতে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?
একেএম শহিদুর রহমান: না, রাতে সেভাবে আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ আমার হয়নি। পরদিন ৬ আগস্ট সকালে আমি ট্রিপল নাইন সার্ভিসের অ্যাডিশনাল ডিআইজিকে কল দিলাম। যেকোনোভাবে লোকজন জোগাড় করে ট্রিপল নাইন চালু করতে বললাম। আমি সিভিল ড্রেসে পুলিশের একটা প্রাইভেট কারে করে সেখানে গেলাম। দেখলাম কোনোমতে তারা সার্ভিসটা চালু করেছে। খবর পেলাম রাজারবাগ পুলিশ লাইনে বিদ্রোহ চলছে। যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের লাশ ঝুলছে। অনেক জায়গায় পুলিশের লাশ পড়ে আছে।
আগামীর সময়: পরদিন পুলিশের সিনিয়রদের মধ্যে কারও সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়েছিল?
একেএম শহিদুর রহমান: শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা যারা পালিয়ে যাননি, তাদের সঙ্গে আস্তে আস্তে যোগাযোগ শুরু হলো। আমরা পুলিশ অফিসার্স মেসে জড়ো হলাম। আমিই সবার চেয়ে সিনিয়র ছিলাম। পুলিশের অধস্তন সদস্যরা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন। হেডকোয়ার্টার বন্ধ। ডিএমপি বন্ধ। পুলিশের লাশের স্তূপ। আমাদের মনের অবস্থা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন! পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমাকে কন্টাক্ট পারসন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো। মিডিয়ার মাধ্যমে সেটা প্রচার করা হলো।
আগামীর সময়: তারপর কী করলেন?
একেএম শহিদুর রহমান: যে যেভাবে পারি মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আসতে বললাম। ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রথম মিডিয়াকে ব্রিফ করলাম। জনতাকে অনুরোধ করলাম, ‘আপনারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করবেন না। পুলিশ আপনাদের শত্রু নয়।’
ছয়টি টিম গঠন করলাম। প্রতিটি টিমে পাঁচ-ছয়জন করে পুলিশ। ফ্রিজার ভ্যান নিয়ে টিমগুলোকে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পাঠালাম। আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনে গেলাম। সেখানে গেটে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়ানো। তাদের মধ্যে উত্তেজনা। বিসিএস অফিসার দেখলেই অস্ত্র তাক করবে, গুলি ছুড়বে এমন অবস্থা। ৩০০-৪০০ লোক। সবার হাতে অস্ত্র। বিসিএস অফিসারদের ওপর ব্যাপক ক্ষোভ। কথায় কথায় অস্ত্র তাক করছে। আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছু পুলিশ সদস্য আমাকে কর্ডন করে রাখল। তারা আমার মাথায় হেলমেট দিল। বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরাল আমাকে। একটা হ্যান্ডমাইক দিল। আমি বললাম, ‘অনেক সহকর্মী আর আমাদের মাঝে নেই। আমি তাদের লাশ যার যার ধর্মমতে সৎকারের জন্য এসেছি।’ তখন দেখলাম উত্তেজিত পুলিশ সদস্যরা একটু নরম হলেন।
আগামীর সময়: লাশগুলো সব উদ্ধার হয়েছিল?
একেএম শহিদুর রহমান: উদ্ধার হয়েছিল। রাতের মধ্যে লাশ আস্তে আস্তে রাজারবাগে আনা শুরু হলো। ৭ আগস্ট সকালের মধ্যে আমরা সব লাশ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করলাম। স্বজনরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ডিএমপি, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হলো।
আগামীর সময়: এরপর আপনাকে র্যাবের ডিজির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল?
একেএম শহিদুর রহমান: গণঅভ্যুত্থানের পরদিন ৬ আগস্ট নতুন আইজিপি নিয়োগ হয়েছিল। ৭ আগস্ট আমাকে র্যাবের ডিজি করে প্রজ্ঞাপন জারি করল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। ৮ আগস্ট আমি যোগ দিলাম। তখনো দেশের কোনো থানায়, কোথাও পুলিশ কাজ করছে না। কর্মবিরতির ডাক দেওয়া পুলিশ সদস্যরা নিজেরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখেছিল। আমি র্যাবের টহল টিম সীমিত আকারে নামিয়ে দিলাম সারা দেশে। ৫ থেকে অন্তত ২০-২২ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশ কোথাও সেভাবে কাজ করেনি। সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছিল। অনেকগুলো আন্দোলন আমাদের সামাল দিতে হয়েছিল। দেশকে মোটামুটি একটা স্বাভাবিক ধারায় নিতে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।
আগামীর সময়: পুলিশকে এমন পরিস্থিতিতে কেন পড়তে হলো? এটা নিয়ে বাহিনীতে অভ্যন্তরীণ কোনো মূল্যায়ন হয়েছে?
একেএম শহিদুর রহমান: পুলিশের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। আমি মনে করি, সেটি সম্পূর্ণই বাহিনীর সেসময়কার নেতৃত্বের ভুল এবং ব্যর্থতার কারণে। পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি করা একদম ঠিক হয়নি। প্রত্যাশা করি, এটি আর হবে না। পুলিশ আইনের শাসন মেনে কাজ করতে পারলে জনগণের সঙ্গে সম্পর্কটা সাংঘর্ষিক হবে না। তবে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রে আইনের শাসন থাকতে হবে।




