সম্পাদকীয়
প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিবন্ধকতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি গ্রামের জনসংখ্যার তুলনায় প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা যদি বেশি হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে, কেন একই এলাকায় প্রতিবন্ধিতার এমন অস্বাভাবিক ঘনত্ব— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার আমতৈল গ্রামে ৪ শতাধিক প্রতিবন্ধী মানুষের বসবাস-সংক্রান্ত খবর গতকাল শুক্রবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। এমন সংবাদ উদ্বেগজনক এবং একই সঙ্গে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ‘আমাদের সমাজে আজও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ভাগ্যের লিখন, পাপের ফল কিংবা অলৌকিক কোনো কারণে সৃষ্ট সমস্যা বলে মনে করেন। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরামর্শ গ্রহণের বদলে অনেক পরিবার ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ কিংবা নানা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। এতে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করার সুযোগ নষ্ট হয়, সমস্যাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কুসংস্কার শুধু মানুষের অজ্ঞতার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি। বিশেষ করে গর্ভকালীন পরিচর্যা, মায়ের পুষ্টি, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের পরিচর্যা এবং শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণের বিষয়ে অনেক পরিবার এখনো যথেষ্ট সচেতন নয়। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অথচ সময়মতো চিকিৎসা ও পরামর্শ পাওয়া গেলে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব।
অাধুনিক বিজ্ঞানের এ সময়ে বিশ্বনাথের এই গ্রামে এখনো অনেক পরিবার খোলা শৌচাগার ব্যবহার করে। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বঞ্চিত। সন্তান প্রসবও হয় গ্রামের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এমন বাস্তবতায় সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বৈজ্ঞানিক জরিপ করা প্রয়োজন। গ্রামটির প্রতিবন্ধী মানুষের বয়স, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতার ধরন, জন্মের ইতিহাস, পারিবারিক সম্পর্ক, মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানির উৎস, পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। একই পরিবারের একাধিক সদস্য প্রতিবন্ধী হলে এর কারণও বিশেষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কারণ অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষাই শেষ কথা নয়। ওই গ্রামের প্রতিবন্ধী মানুষদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সহায়ক উপকরণ, পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যারা চলাচলে সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থা দিতে হবে। প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসাসেবাসহ বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের দেশ-সমাজ, জাতির বোঝা নয়, বরং সম্পদ করে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। চার শতাধিক প্রতিবন্ধী মানুষ যদি একই গ্রামের বাসিন্দা হন এবং তাদের প্রতিবন্ধিতার কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিষয়টি জাতীয় জনস্বাস্থ্য আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। প্রশাসনের উচিত দ্রুত মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
মনে রাখা দরকার, কুসংস্কার মানুষকে অন্ধকারে রাখে আর বিজ্ঞান দেয় সত্যের সন্ধান। বিশ্বনাথের এই গ্রামের মানুষের দিকে করুণার চোখে নয়, অধিকার ও মর্যাদার চোখে দেখতে হবে। তাদের দুর্ভোগের কারণ খুঁজে বের করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে গণসচেতনতা বাড়াতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই হবে উত্তম পন্থা। দায়িত্বগুলো রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে পালন করতে হবে।






