আগামীর চোখ
দুই টাকার হাহাকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
সিভিল সার্জন মহাশয় সমীপেষু, কুড়িগ্রাম
আমি কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অতিসাধারণ এবং দরিদ্র মানুষ। আজ বাধ্য হয়ে এই চিঠি আপনাকে লিখছি। কোনো রাগ বা বিবাদ নয়, শুধু মনের কিছু দুঃখের কথা জানাতে কলম ধরা।
গত সপ্তাহে তীব্র জ্বর আর বুকের ব্যথা নিয়ে আমি আপনার হাসপাতালে গিয়েছিলাম। দেখলাম, সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে আরও দুটি করে টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। অঙ্কটা ভারি চমৎকার, মাত্র দুই টাকা! এই বাজারে দুই টাকার কীই বা মূল্য আছে? একটা সস্তা লজেন্সও এখন দুই টাকায় মেলে না। এই দুই টাকা হয়তো আপনাদের বিকালের চায়ের আসরের তুচ্ছ বকশিশ হিসেবেও অচল।
কিন্তু এই তুচ্ছ দুই টাকাই যখন প্রতিদিন শত শত রোগীর পকেট থেকে খসে পড়ে, তখন বছরের শেষে তা লাখ লাখ টাকার এক রাজকীয় তছরুপের খতিয়ানে গিয়ে দাঁড়ায়। গরিবের রক্তের ফোঁটা জমে জমে যে এমন চোরাবালি সৃষ্টি হতে পারে, তা আপনাদের এই পুণ্যভূমিতে না এলে আমি জানতে পারতাম না। মহামতি কার্ল মার্ক্সের পুঁজির পাঠশালা যেন আপনার হাসপাতালখানি।
এই দুই টাকার চোরাস্রোতটি কার পকেটে গিয়ে মহাসমুদ্র তৈরি করছে
এই দুর্নীতির সমান্তরালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাকি দৃশ্যপটও বেশ দার্শনিক। চিকিৎসকরা সেখানে ঈশ্বরের মতোই অলক্ষ্য, অর্থাৎ তারা অনুপস্থিত। কর্মচারীদের দেখা মেলা ভার। এক্স-রে মেশিনটি এক কোণে পড়ে থেকে যেন নির্বাণের আনন্দ উপভোগ করছে, তার কোনো সচলতা নেই। আর রোগীরা? তারা অনন্তকাল ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে লাইফ অ্যান্ড ডেথের অন্তহীন দর্শনতত্ত্ব আওড়াচ্ছেন। আপনি এই জেলার চিকিৎসার বড় কর্তা। আপনি চাইলে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। রোগের উপশম না হোক, এই দুই টাকার চোরাস্রোতটি কার পকেটে গিয়ে মহাসমুদ্র তৈরি করছে, সে রহস্যটুকু কি দয়া করে উন্মোচন করবেন? নাকি গরিবের এই ক্ষুদ্র হাহাকারটুকুই আপনাদের এই ব্যবস্থার আসল মুনাফা? আশা করি, এই নীরব শোষণের একটা বিহিত করবেন। সে সঙ্গে হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারীদের একটু বুঝিয়ে বলুন, তারা যেন আমাদের সঙ্গে অন্তত একটু মানুষের মতো ব্যবহার করেন। টাকা না থাকতে পারে; কিন্তু আমাদেরও তো একটা ভাঙা বুক আর আত্মসম্মান আছে। আশা করি, এক গরিব রোগীর এই আকুল আবেদন আপনি ফেলে দেবেন না। আমাদের একটু সুস্থভাবে বাঁচার সুযোগ করে দেবেন।
বিনীত
চিকিৎসাপ্রার্থী এক গরিব রোগী




