স্বস্তি নেই বাজারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি যেন এখন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিছুদিন আগে অতিবৃষ্টির অজুহাতে সবজির দাম বাড়ানো হয়েছিল। বৃষ্টি কমেছে, আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়েছে; কিন্তু বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। বরং এবার ডিম ও মাছের দামও এমন পর্যায়ে উঠেছে যে, সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে। এক পণ্যের দাম সামান্য কমলে অন্য পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে বাজারে স্বস্তি ফিরছে না কোনোভাবেই। প্রশ্ন হলো— এই দুষ্টচক্রের শেষ কোথায়?
গতকাল শনিবার ‘আগামীর সময়’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সবজির মূল্য একটু কমলেও পুরো বাজারের চিত্র বদলায়নি; বরং ডিমের দর দুই সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী। একই রকম চলছে মাছের বাজারও। মুরগি ও অন্য মাংসের দামেও রয়েছে অস্বস্তি। এবারেও স্পষ্ট হলো, বাজারে সক্রিয় রয়েছে ভোক্তার পকেট খালি করার দুষ্টচক্র। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি সহসা ঘটছে না। আমিষের ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
দুঃখজনক হলো, আমাদের বাজারে দাম বাড়ানোর ছুতার অভাব নেই। কখনো বৃষ্টি, কখনো বন্যা, কখনো পরিবহন ব্যয়, কখনো জ্বালানি, কখনো আমদানি ব্যয়, আবার কখনো সরবরাহ সংকট; প্রতিটি পরিস্থিতিই যেন ব্যবসায়ীদের একাংশের কাছে দাম বাড়ানোর জাদুর কাঠি। কিন্তু দাম কমানোর কারণ খুব কমই পাওয়া যায়। উৎপাদন ভালো হলে দাম কমে না, পরিবহন স্বাভাবিক হলে দাম কমে না, সরবরাহ বাড়লেও কমে না দাম। এ এক হযবরল বাজারব্যবস্থা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কৃষক বা উৎপাদক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তাকে সেই পণ্যের জন্য কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত হয়। প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় পরিবহন, সংরক্ষণ, শ্রম ও মুনাফার খরচ।
এসব খরচের যৌক্তিকতা থাকলেও কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক মুনাফা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুদদারি কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ বেশ পুরনো। এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও প্রতিকার না হওয়ায় এ চক্র ফের সক্রিয় হতে সাহস পায়। এটি বিচার বা শাস্তিহীনতার সংস্কৃতির মন্দ উদাহরণ।
বাজার নিজে ন্যায্যতা নিশ্চিত করে না; প্রয়োজন কার্যকর প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ। ব্যবসার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন অপরাধ নয়। কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, তথ্য গোপন করা বা ভোক্তার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন গ্রহণযোগ্য নয়।
এক পণ্যের দাম কমলেই যদি আরেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা কোনো একক পণ্যে নয়; সমস্যা বাজার ব্যবস্থাপনার গভীরে।
তাই সাময়িক অভিযান দিয়ে নয়; দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমে এ অস্থিরতা দূর করা সম্ভব। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোরতা দেখাতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে।
এখন বাজারকে নিজস্ব গতিতে ছেড়ে দিয়ে পরে অভিযান চালানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যদি মূল সমস্যাটি থেকেই যায়।
আগে প্রয়োজন সিন্ডিকেট নির্মূল, শক্তিশালী নজরদারি, কঠোর সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। নিত্যপণ্য কোনো বিলাসদ্রব্য নয়; এখানে বেঁচে থাকার প্রশ্ন। বাজার যদি কিছু অসাধু গোষ্ঠীর ইচ্ছার দখলে থাকে, তবে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সংস্কার।




