সম্পাদকীয়
কারসাজি চক্রের শিকল ভাঙবে কে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শেয়ারবাজার বহুবার কারসাজির শিকার হয়েছে। গুজব ছড়িয়ে, সমন্বিত লেনদেনের মাধ্যমে বা কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে কিছু গোষ্ঠী অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলে। পরে তারা উচ্চ দামে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যায়, আর ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বাজারের প্রতি মানুষের আস্থার পারদও হয় নিম্নগামী। গতকাল মঙ্গলবার ‘আগামীর সময়’-এ ‘উত্থান বাজারে সক্রিয় কারসাজি চক্র’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ৪২৫ পয়েন্ট বা ৮ শতাংশ বেড়েছে। বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির পাশাপাশি ব্যবসায়িক লোকসানে থাকা কোম্পানির শেয়ারদরও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এ প্রবণতা সন্দেহজনক হিসেবেই পর্যবেক্ষকরা দেখছেন।
দীর্ঘ মন্দার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সূচকের ঊর্ধ্বগতি, লেনদেন বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থার আংশিক প্রত্যাবর্তন অর্থনীতির জন্য একটি শুভ লক্ষণ। একটু ভালোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মধ্যেই যদি একটি অসাধু চক্র কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানোর মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তাহলে সেই অর্জন মুহূর্তেই ভেস্তে যেতে পারে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি।
বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী বাজারে যদি আবারও একই চিত্র দেখা দেয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাজারের স্বাভাবিক গতি কাজে লাগিয়ে কারসাজিকারীরা যদি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর নীরব থাকার সুযোগ নেই। কারা অস্বাভাবিক লেনদেন করছে, কোন শেয়ারের মূল্য অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত— এসব শনাক্ত করার জন্য আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, অতীতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে কারসাজির অনেক রাঘববোয়াল পার পেয়ে গেছে। এখন তাদের শিকল ভাঙার সময় এসেছে। অপরাধ করেও তারা অতীতে সমাজে বুক ফুলিয়ে বেড়িয়েছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পথে দাাঁড়ানোর সেই অশ্রুসজল দৃশ্য দেশবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি। আর মর্মস্পর্শী আত্মহননের কথা উল্লেখ করে পাঠকের হৃদয় ভারী করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। অতীতের এমন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ফিরে না আসুক— এটাই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের চাওয়া।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কেবল অনিয়মের পর তদন্ত করা নয়; বরং আগেভাগেই কারসাজি প্রতিরোধ করা। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত, দৃশ্যমান শাস্তি এবং অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে একই অপরাধ বারবার ফিরে আসবে।
পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন হতে হবে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা তথাকথিত ‘নিশ্চিত লাভের’ প্রলোভনে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির মৌলভিত্তি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সচেতন বিনিয়োগকারীই একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল বাজারের অন্যতম ভিত্তি।
শেয়ারবাজার কোনো জুয়ার আসর নয়; এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই বাজারে বর্তমান ইতিবাচক ধারা যেন কারসাজিকারীদের হাতে জিম্মি না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।




