সম্পাদকীয়
পরামর্শকের পুষ্টিসাধন!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পথশিশুদের জন্য একটি আবাসন ও পুনর্বাসন প্রকল্প— শুনলেই মনে হয়, এ তো রাষ্ট্রের মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যে শিশুর মাথার ওপর ছাদ নেই, যার হাতে বইয়ের বদলে জীবিকার বোঝা, যে শিশু স্কুলের বেঞ্চের পরিবর্তে ফুটপাতকে নিজের ঠিকানা বানিয়ে বড় হচ্ছে, তার জন্য রাষ্ট্র যদি নিরাপদ আশ্রয়-শিক্ষা, চিকিৎসা-প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে; তার চেয়ে মহৎ উদ্যোগ আর কী হতে পারে? ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন’ প্রকল্পটি সেই মানবিক দায়িত্ব পালনেরই একটি বড় উদ্যোগ।
কিন্তু মহৎ উদ্যোগের আড়ালে যদি পরামর্শকের নামে অযৌক্তিক ব্যয়ের আয়োজন করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। আর সেই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয় যখন প্রকল্পের পুনর্বাসনে ৪২৬ কোটি টাকা মোট ব্যয় অথচ পরামর্শের জন্য প্রস্তাব করা হয় প্রায় ৭ কোটি টাকা। তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে— পথশিশুদের পুনর্বাসনের প্রকল্পে পরামর্শকের এত বড় ভূমিকা কেন? কী এমন জটিল কারিগরি কাজ আছে, যার জন্য কোটি কোটি টাকা পরামর্শ ফি দিতে হবে
এ প্রকল্পটি আজ রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ওঠার কথা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেলে তা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। চলতি বছর শুরু করে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন এবং সমাজের মূল স্রোতোধারায় সম্পৃক্তের উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ৬ হাজার ৬০০
এত বড় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞর সহায়তা প্রয়োজন— এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ‘পরামর্শ প্রয়োজন’ আর ‘পরামর্শের নামে কোটি কোটি টাকা প্রয়োজন’— এক কথা নয়।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, শিশু একাডেমি, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যখন এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, তখন তাদের নিজস্ব সক্ষমতা কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিও দেখার বিষয়। প্রতিটি কাজের জন্য বাইরে থেকে পরামর্শক নিয়োগ এবং তার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের প্রবণতা সরকারি প্রকল্পে নতুন নয়।
৭ কোটি টাকা ছোট অঙ্ক নয়। এ অর্থ দিয়ে কত শিশুর খাবার নিশ্চিত করা যাবে? কত শিশুর শিক্ষা উপকরণ দেওয়া যাবে? কত শিশুর চিকিৎসা করা যাবে? কত পরিবারকে সন্তানকে পথে না নামিয়ে ঘরে রাখার জন্য সহায়তা দেওয়া যাবে? কত শিশুকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে জীবিকার পথে নেওয়া যাবে—এসব হিসাবও মাথায় রাখতে হবে এবং জনগণের সামনে আসা উচিত। এই অঙ্কটা যদি পরামর্শকের পকেটে যায়, তবে পথশিশুদের কল্যাণে কার্যক্রমে কতখানি ঘাটতি
রাষ্ট্রের কাছে পথশিশু কোনো প্রকল্পের সংখ্যা নয়। তারা দেশেরই নাগরিক, ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি, ভবিষ্যতের ভোটার, ভবিষ্যতের শিক্ষক-প্রকৌশলী-উদ্যোক্তা। তাদের জীবন বদলানোর সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সুতরাং পথশিশুদের জন্য প্রকল্প হোক, কিন্তু তাতে যেন পথশিশুদের পাতে পরামর্শকের থাবা বসানোর সুযোগ না থাকে।



