সতর্কসংকেত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মতিঝিল ও আশুলিয়ায় শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর দাবি, বোমাগুলো বিস্ফোরিত হলে বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হতে পারত। সৌভাগ্যবশত তা ঘটেনি। কিন্তু একটি বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং তখনই শুরু হয় আরও কঠিন দায়িত্ব— কারা এসব বিস্ফোরক তৈরি করল, কোথা থেকে এলো, কারা বহন করল এবং কী উদ্দেশ্যে এগুলো সেখানে রাখা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের নির্ভুল জবাব খোঁজা।
দুটি েবামা উদ্ধারের বেশ কদিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ প্রকৃত ঘটনা জানাতে পারেনি। কারা জড়িত, সেটিও শনাক্ত করতে পারেনি। এটি হতাশাজনক। উদ্বেগের বিষয় এই যে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পরও যদি তদন্তে দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা না যায়, তবে জনমনে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। অপরাধী শনাক্তে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা তদন্তে দুর্বলতা কেবল একটি মামলার ব্যর্থতা নয়; সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্যও ভুল বার্তা বহন করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা তখনই দৃঢ় হয়, যখন তারা শুধু বিপদ এড়াতে নয়, অপরাধের নেপথ্যের চক্রও দ্রুত উন্মোচন করতে সক্ষম হয়।
দেশ অতীতে ভয়াবহ জঙ্গি সহিংসতা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা ও ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিসানে হামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এরপর বহু বছর ধরে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা ও আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। সেই উন্নতি ধরে রাখা খুবই দরকার। দীর্ঘদিন আপাতদৃষ্টিতে জঙ্গি কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়— উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। ছোট একটি ঘটনার প্রতিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হয়, যাতে কোনো সংগঠিত নাশকতামূলক নেটওয়ার্ক থাকলে তা শুরুতেই ভেঙে দেওয়া যায়।
সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনো জঙ্গি বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও শূন্য সহনশীলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সরকার যেন একটি অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থায় না পড়ে, সেদিকে সরকারকেই খেয়াল রাখতে হবে। তবে মনে রাখা দরকার, এমন ঘটনা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য একটি সতর্কসংকেত। যদি কোনো চরমপন্থী বা নাশকতামূলক চক্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করে থাকে, গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা জরুরি।
এখানে পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিস্ফোরক উদ্ধারের পর তদন্তের গতি যদি মন্থর হয় কিংবা অপরাধীদের শনাক্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে, তার সমালোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। আধুনিক প্রযুক্তি, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়— সবকিছু কাজে লাগিয়ে দ্রুত তদন্ত এগিয়ে নেওয়া উচিত। অপরাধীরা ধরা না পড়লে শুধু একটি মামলাই ঝুলে থাকে না; ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধের সুযোগও কমে যায়।
একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র বা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সতর্কতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির ওপর। মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনা যেন আরেকটি বিস্মৃত তদন্তে পরিণত না হয়। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জনসাধারণকে জানানো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে সংশোধন করাই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়।






