যে জীবন সেলফির

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ স্বচক্ষে দেখতে বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে হাজির ছিলেন ৮৫ হাজার দর্শক। আমি টিভিতে এ খেলা দেখার সময় লক্ষ রাখছিলাম গ্যালারির দর্শকদের দিকে।
মেসি যখন বেনিনের গোলপোস্টের সামনে ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে দর্শকদের প্রায় সবাই তাকিয়ে ছিলেন তাদের নিজ নিজ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। তাদের সামনে মেসি। ফ্রি-কিক নিচ্ছেন। কিন্তু তারা তাকিয়ে রয়েছেন স্ক্রিনে। কারণ তারা এ মুহূর্তের ছবি তুলছেন বা ভিডিও করছেন। তারা দৃশ্যটি দেখছিলেন ক্যামেরার চোখ দিয়ে।
দর্শকরা দেখতে এসেছেন একটি জলজ্যান্ত মেসিকে।
কিন্তু তারা মেসির একটি প্রতিরূপ দেখছেন। সেই প্রতিরূপকে ধারণ করতে চাইছেন একটি ভবিষ্যৎ ডিজিটাল মেমোরির সঞ্চয় হিসেবে। বাস্তব মেসির েচয়ে মেসির সামনে নিজের উপস্থিতির প্রমাণ সংগ্রহ করাই তাদের কাছে বেশি কাম্য।
এ দৃশ্য আমাকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিল।
আমরা এ যুগের মানুষ আদৌ কি আর কোনো কিছুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি? মুহূর্তকে আমরা কীভাবে যাপন করি? আমরা কি এখন জীবনকে যাপন করার চেয়ে জীবনযাপনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে বেশি আগ্রহী? আমরা কি আদৌ আর কোনো কিছু উপভোগ করি, নাকি উপভোগের প্রামাণ্যতা উপভোগ করি?
এটিকে আমি আর শুধু স্মার্টফোনের আসক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যা হিসেবে দেখি না। বরং এর পেছনে আমি দেখতে পাই অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, আত্মপরিচয়, সামাজিক স্বীকৃতি, প্রযুক্তি এবং বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পরিবর্তন।
আপনি নাগরকোটে ভোরবেলার সূর্যোদয় দেখছেন না আর। কিংবা কোনো রেস্টুরেন্টে খাবার খাচ্ছেন না। আপনি সূর্যোদয়ের এবং রেস্টুরেন্টের খাবার খাওয়ার মুহূর্তটির একটি ভবিষ্যৎ ডিজিটাল স্মৃতির রসদ সংগ্রহ করছেন। নিজের স্মৃতি যাপন করছেন।
ছবি মানুষ আগেও তুলত। ছোটবেলার পিকনিক বা কারও বিয়েতে মামা-খালাদের একত্রে ছবি আমাদের টাইম মেশিনের মতো সেই মুহূর্তগুলোয় নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে একটি ক্যামেরাম্যানের দিকে মনোযোগ সবারই ছিল। কিন্তু আমাদের মুহূর্তগুলো এবং মুহূর্তের অভিজ্ঞতাগুলো তখনও ছবির ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে পড়েনি।
যখন ক্যামেরা ছিল না, আবিষ্কৃত হয়নি; তখন মানুষ মুহূর্তগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখত ডায়েরি লিখে। তাজউদ্দীন আহমদ প্রতিদিন শোয়ার আগে ডায়েরি লিখতেন। সেদিনের সব ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। চার্লস ডারউইনেরও স্বভাব ছিল প্রতিদিনের সব অভিজ্ঞতা লিখে রাখা। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। সবসময় তার হাতে একটি নোটবুক থাকত। টুকে রাখতেন। কিন্তু সেই ডারউইনও বোধ করি বর্তমান সময়ের এই সেলফি তোলার গণবাতিক দেখে হাঁপিয়ে উঠতেন। কারণ ডারউইনও তার জীবনের কিছুটা সময় আলাদা করে রাখতেন, যখন তিনি বাগানে তার পরিবারের সঙ্গে হাঁটতে বের হতেন। সঙ্গে থাকত তার প্রিয় কুকুর। তার হাতে তখন কোনো নোটবুক থাকত না। তিনি উপভোগ করতেন প্রকৃতির সঙ্গ। তিনি অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতির মধ্যে তফাত করতে পারতেন।
আমার শৈশবকালের মাত্র দুটি ছবি আছে। দুটিই স্টুডিওতে। একটিতে আমি একা একটি বেতের চেয়ারে বসে আছি। আরেকটিতে জুতা-মোজা পরে আমি আর আমার ভাই দাঁড়িয়ে আছি। একটি আমার দেড় কি দুই বছর বয়সের ছবি। আরেকটি তিন বছরের। আমার মেয়ের জন্মমুহূর্ত থেকে শুরু করে প্রায় প্রতি মাসের ছবি ও কিছু ভিডিও সংরক্ষিত আছে হার্ড ডিস্কে। শৈশবে যে ভাড়া বাসায় আমি বড় হয়েছি, সেটির কোনো ছবি নেই। সেই একতলা বাড়ি এখন বহুতল ভবন হয়ে গেছে। কুয়োতলা, বাড়ির সামনের খোলা জায়গা— কিছুই আর নেই। সেগুলোর স্মৃতি আমার মগজে আছে। কিন্তু আমার মেয়ে যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছে, যেটির প্রতিটি কোণের ছবি ও ভিডিও আছে। মাঝেমধ্যে আমি ভাবি, সার্বক্ষণিক ফ্রেমবদ্ধ মুহূর্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমার শৈশব স্মৃতি এবং আমার মেয়ের শৈশব স্মৃতির মধ্যে বড় কোনো তফাত ঘটে গেছে কি না। ঘটেছে। আমার মেয়ের স্মৃতি ওইসব ছবির ভেতর দিয়ে প্রক্ষিপ্ত হয়।
ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্রের সঙ্গে আমাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমে প্রথম আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন সুসান সনটাগ নামের এক আমেরিকান লেখক ও সমালোচক। তিনি ১৯৭০-এর দশকে পর্যটন, ছবি তোলা এবং অভিজ্ঞতাকে ছবিতে রূপান্তর করার প্রবণতা নিয়ে লিখেছিলেন। তার বক্তব্য, ছবি তোলা কোনো অভিজ্ঞতার প্রমাণ তৈরি করতে পারে, আবার অভিজ্ঞতাকে ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে সেটি থেকে আমাদের দূরেও সরিয়ে দিতে পারে। পর্যটকরা যখন কোনো জায়গায় গিয়ে ছবি তোলেন, তারা সেখানে যাওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ সংগ্রহ করেন। ছবি তোলা তাদের কাছে অভিজ্ঞতার স্মারক; কিন্তু সেই ছবি তোলার তাগিদেই তারা জায়গাটিকে সরাসরি অনুভব করার সুযোগ হারান। ছবি তোলার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে একধরনের অধিকারভুক্ত বস্তুতে পরিণত করি।
মেসির শেষ ম্যাচের দর্শকদের কথায় ফিরে যাই। ম্যাচ শেষে তারা নিশ্চিতভাবে ঘরে ফিরেছেন ম্যাচের স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি ছবি ও ভিডিও নিয়ে। একভাবে দেখলে তারা ফুটবল ম্যাচ দেখার কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেননি। তাদের অভিজ্ঞতা তাদের মোবাইল ফোন ক্যামেরার ফ্রেমগুলোর ভেতরে বন্দি হয়ে গেছে।
এই আলোকচিত্রময় জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে আমরা হয়তো দেখব, পুরো জীবনটি আমরা হয়তো আর যাপনই করিনি। পুরো জীবনের একটি ডিজিটাল স্মৃতির রসদ হয়ে থেকেছি আমরা। আমরা অভিনয় করেছি ক্যামেরার সামনে।



