বাজারি উন্নয়ন ও জীবনের অভিধান

‘কলকাতার কোনো রিকশাচালক যখন দুপুরের কঠিন রোদ পেরিয়ে প্রিয় মানুষটির পাশে কিছুক্ষণ বসে নির্ভার বাতাস খুঁজে নেয়, সেই ক্ষণিক অবকাশটি জাতীয় আয়কে সামান্য কমিয়ে দেয়। অথচ নাইরোবির একজন কাঠুরে একই সময়ে একটি গাছ কেটে ফেলে; তার শ্রমমূল্য আর কাঠের দাম মিলে জিডিপি বেড়ে যায়। কিন্তু হারানো ছায়া, শীতলতা, শোভা কিংবা পাখির অবসর বাসস্থানের ক্ষতিপূরণ হিসাবের খাতায় আর কোথাও ধরা পড়ে না।’ [অভিজিৎ ভি. ব্যানার্জি এবং ইস্থার ডুফ্লো]
উপরোক্ত বৈপরীত্যই বলে দেয়, জিডিপি আসলে বাজারে টাকার হাতবদলের একটি স্থূল পরিমাপ, যা বাজারজাত করা যায় না, তাকে সে অবজ্ঞা ভরে ছুড়ে ফেলে। এ কারণেই জিডিপিনির্ভর উন্নয়নকে অনায়াসে ‘বাজারি উন্নয়ন’ বলা যায়। এটি এমনই উন্নয়ন, যার মানদণ্ড ঠিক হয় বাজারে টাকার দৌড়ঝাঁপ দিয়ে; জীবনের অনাবিল সৌন্দর্য বা সমবেত কল্যাণ দিয়ে নয়।
বাজারি উন্নয়ন যতটা না জীবনের, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্যের ভাষায় কথা বলে। উন্নয়নশীল দেশগুলো তাই প্রবৃদ্ধির জাদুবাক্য উচ্চারণে মশগুল। প্রবৃদ্ধি মানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর তার চালিকাশক্তি অবকাঠামো। সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর— ব্যয়বহুল এই কাঠামো হুলুস্থূল তাড়ায় নির্মিত হয়, যেন প্রবৃদ্ধির কৃত্রিম উত্তাপেই সদা তেজি থাকে অর্থনীতি। কাজের সুযোগ সাময়িক বাড়ে, নগদ প্রবাহে আসে খানিক চনমনে ভাব, কিন্তু এই মোহময় নির্মাণের বিপুল ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রকে গোগ্রাসে ঋণ গিলতে হয়। সেই ঋণের সুদে‑আসলে যখন টান পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক প্রভুদের মন রাখতে সরকার হাত বাড়ায় কৃচ্ছ্রনীতির দিকে। মজুরি সংযম, সামাজিক নিরাপত্তার খাতে ছাঁটাই, কৃষি‑স্বাস্থ্য‑শিক্ষা খরচে কাটছাঁট; কর্মসংস্থানের সংকট, জনঅসন্তোষ, আন্দোলন— সব মিলিয়ে অর্থনীতি অস্থির হয়, সমাজের মূল সুরও তা-ই।
এই অস্থিরতার মধ্যেই বাজারি উন্নয়ন মানুষের মনের মানচিত্র পাল্টে দেয়। দ্রুতগামী হাইওয়ে আর ইন্টারনেট মিলে গ্রাম‑শহরের পর্দা সরায়; দেশ-বিদেশের দূরত্ব চুপি চুপি গলে যায় বিজ্ঞাপনের উসকানিতে। ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ গণমাধ্যমের ঝলমলে স্লোগান বলে দেয়, স্বপ্নের ঠিকানা শহরেই; মাতৃভূমি যেন উৎসবের মাত্র কটা দিনে ফেরা এক নিষ্প্রাণ স্মৃতি।
উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমন্বিত সুর, যেখানে প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা স্থান পাবে, স্থান পাবে মানুষের মর্যাদা সমাজের ন্যায়বিচার প্রকৃতির সহিষ্ণুতা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ সালে বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন বাণিজ্যের বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যার বড় অংশই ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল অনুন্নত বা কম উন্নত দেশের অপেক্ষাকৃত কম শিল্পায়িত এলাকায়। বিজ্ঞাপনগুলো শহরের গগনচুম্বী গ্লাস‑কংক্রিটকে ‘সর্বাধুনিক’রূপে সাজিয়ে তুলেছে আর গ্রামের ঘরকে নির্দেশ করেছে পশ্চাৎপদতার প্রতিধ্বনি হিসেবে, যেন স্বদেশি সব শুধু অন্ধকার আর অচলতা।
এই ‘সব বিদেশি ভালো’ অনুভব কিন্তু এমনি এমনি জন্মায় না। উন্নত পুঁজিবাদী দেশে যখন শিল্প যত প্রগাঢ় যান্ত্রিকতায় ঝকমক করে ওঠে, তখন মেশিন ও কাঁচামালের পুঁজির অনুপাত— মার্ক্স যাকে ‘জৈবিক পুঁজি-সংগঠন’ বলেন— ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শ্রমিকের সংখ্যাগত অংশ কমে যৌগিক মূলধনে আটকে যায়। ফলে একক শ্রমিক যত ‘বাড়তি মূল্য’ যোগ করেন, তার বিপরীতে প্রতিটি পণ্যে গড় মুনাফার হার দীর্ঘসূত্রে হ্রাস পায়— এটাই মুনাফার হার হ্রাসের প্রবণতা।
শুধু মেশিন নয়; জীবন্ত শ্রমও যে বাড়তি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে, এই ঐতিহাসিক সত্যকে ঢাল হিসেবে রেখে পুঁজির উৎসাহ তখন নতুন উদ্দেশ্য খোঁজে সেইসব ভূখণ্ড, যেখানে শ্রম সস্তা, পরিবেশ আইন নিস্তেজ আর স্থানীয় বাজার উন্মুখ। অনুন্নত দেশে পুঁজি রপ্তানি তাই শুধু লাভের কৌশল নয়; বরং পুঁজিবাদের স্বাভাবিক আত্মরক্ষা। এই কৌশল টিকিয়ে রাখতে দরকার ‘বিদেশি পণ্যই উন্নত’— এই বীক্ষার সংস্কৃতি। কেননা এই বিশ্বাস দৃঢ় হলেই অনুন্নত দেশগুলো বিনিয়োগের আমন্ত্রণপত্র আর আইন-শিথিলতার লোভনীয় প্যাকেজ নিয়ে নিজেই ছুটে আসে।
আর পুঁজি যখন আসে, বেড়ে ওঠে কাগুজে সমৃদ্ধি, স্টক সূচকের উল্লম্ফন, নগরের আকাশে ক্রেনের শত শত হাত। স্লোগান দেয় উন্নয়ন হচ্ছে। অন্যদিকে ফুরিয়ে যাওয়া নদী, বিষাক্ত মাটি, বৈশাখী তাপপ্রবাহে জ্বলতে থাকা বাতাস একসময় গ্রামের মাঠে জন্মানো মানুষকে ভিড় করায় শহুরে বস্তির রুক্ষ ছাউনিতে। এসবের খরচ বাজারি উন্নয়নের পাঠ্যবই রাখে না। জিডিপির মাপজোকের বাইরে পড়ে থাকে গাছের হারানো ছায়া রিকশাচালকের এক ঘণ্টা হিসাবহীন সুখ, মাটির ঘ্রাণ। গ্রামের খোলা প্রান্তরে বেড়ে ওঠা শিশুর স্বপ্ন তখন ধাক্কা খায় বস্তির সংকীর্ণ দেয়ালে।
এই বাজারি উন্নয়ন কি সত্যিই উন্নয়ন? হয়তো জিডিপি নামের অভিধানে, কিন্তু জীবনের অভিধানে নয়। কে বোঝাবে, উন্নতির মানে শুধু সংখ্যা নয়। আমরা বাজারকে উপেক্ষা করতে পারব না, কিন্তু তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে উন্নয়নও করতে পারব না।
উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল এমন এক সমন্বিত সুর, যেখানে প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা যেমন স্থান পাবে, তেমনি স্থান পাবে মানুষের মর্যাদা, সমাজের ন্যায়বিচার, প্রকৃতির সহিষ্ণুতা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য। না হলে আগামী এক বিকালের রোদে যখন আর কোনো ছায়া থাকবে না, তপ্ত হাইওয়ে ধরে হেঁটে চলা মানুষটি বুঝে উঠতে পারবে না, সে ঠিক কোন উন্নয়নের নাগরিক। তখন এক ত্রিকালদর্শী পক্ব কেশের বৃদ্ধের মতো বলতে হবে, উন্নয়নের কত কত মাপকাঠি; ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা, আকাশ ছোঁয়া উড়ালসেতু, কাচ আর কংক্রিটের দেয়ালে মোড়ানো আলোকোজ্জ্বল নগর, কিন্তু আমি দেখি নদী। আগে নদী ছিল, অনেক নদী ছিল। এখন তারা নেই, শুধু নাম আছে, মানচিত্রে কিছু রেখা, কিছু ভেজা স্মৃতি। উন্নয়ন আসে, আলো আসে; কিন্তু জলের ধারা শুকিয়ে যায় চোখের জল হয়ে।
লেখক: প্রাবন্ধিক



