শিশুর টিকাদান নিয়ে আরও সচেতনতা জরুরি

দেশজুড়ে গত ৫ই এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি। সেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সেন্টার থেকে তোলা। ছবি : আশিকুর রহমান
দেশজুড়ে সরকারিভাবে শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। তবে ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে অনেক শিশু। এই মৃত্যুর ভয়াবহতায় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে টিকাদান নিয়ে নানা ধরনের অপতথ্যের ছড়াছড়ি। এগুলো মানুষের মনে ভরসার পরিবর্তে এনে দিচ্ছে নতুন উদ্বেগ।
একদিকে মৃত্যুর আতঙ্ক, অন্যদিকে টিকা নিয়ে উদ্বেগ–এ দুয়ের চাপে দিশেহারা তারা। কিসে মানুষ ভরসা করবে, সেটিই যেন ঠিক করে উঠতে পারছে না। এত শিশুর মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সরকারিভাবে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর অনেক মানুষ দ্বিধান্বিত–তাদের শিশুকে তারা টিকা দেবেন কিনা। এ বিষয়টি নিয়ে কথা হওয়া তাই জরুরি।
রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসক বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন। শিশুর রোগ প্রতিরোধ বাড়াতে এবং তাকে সঠিক চিকিৎসা দিতে কী করতে হবে–সেরে নিতে পারেন সেই প্রাথমিক পরামর্শও
এরই মধ্যে সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং এতে শিশু মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় মানুষ যেন আর দ্বিধার জায়গা থেকে বের হতে পারছে না। আতঙ্ক তাড়া করছে প্রত্যেক মা-বাবাকে। এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি বাচ্চাদের সাধারণ জ্বর, কাশি বা র্যাশ দেখা দিলেই অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। অথচ এসবের পরিবর্তে সচেতন হওয়া, টিকা দেওয়া, আক্রান্ত বাচ্চাকে সবার কাছ থেকে আলাদা রাখা এবং তাকে সুচিকিৎসা ও যত্নের মধ্যে রাখা খুবই জরুরি। সেসব দিকে এবার নজর দেওয়া দরকার।
হাম খুব ছোঁয়াচে একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও রোগের জীবাণু খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা যেকোনো মানুষ দ্রুততম সময়ে রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। বর্তমানে ৯ মাসের কম বয়সী বাচ্চারাও হামে আক্রান্ত হয়েছে। অথচ গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি ৯ মাসের কম বয়সী শিশুর শরীরে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, মায়ের যদি টিকা না দেওয়া থাকে, তাহলে বাচ্চা প্রাকৃতিকভাবে এই সুরক্ষা পায় না। মায়ের শিশুকালে তাকে হামের টিকা না দেওয়া হলে অথবা যেকোনো কারণে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির তারতম্যের কারণেও হতে পারে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু হামে আক্রান্ত।
দেশে হাম সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে এমন বেশকিছু শিশুর দেখা পেয়েছি আমরা। বয়স অত্যন্ত কম হওয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুততম সময়ে কমেছে। মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হওয়া সেসব শিশুকে আটকাতে পারেনি স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এ ব্যর্থতা মেনে নিয়েই কাজ করে যেতে হয়েছে আমাদের।
বর্তমানে হামের যে পরিস্থিতি তাতে দেখা যাচ্ছে পাঁচ বছরের নিচে থাকা শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আর আক্রান্ত হওয়ার পরপরই নিউমোনিয়া, দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা ও মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। এমনকি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গিয়ে অন্যান্য শক্তিশালী সংক্রমণ (সেপ্টিসিমিয়া) হয়ে অকেজো হয়ে যেতে পারে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো। ফলে ঘরে যদি এই বয়সী কোনো শিশু থাকে, তাহলে সচেতন হওয়া ছাড়া আপনার ভিন্ন কোনো উপায় নেই।
ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোয় অভিভাবকরা অনেক বেশি সচেতন। তারা সরকারি সুবিধা না পেলে নিজ উদ্যোগে বেসরকারিভাবেও শিশুদের টিকা দিয়ে থাকেন। অবশ্য দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ টিকা নিয়ে সন্দেহ বা দ্বিধায় ভোগেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের একনিষ্ঠ শ্রমের ফসল এই টিকা। অভিভাবক হিসেবে আপনি যত দ্বিধায় ভুগবেন, মৃত্যুদূত ততই আপনার দরজায় কড়া নাড়তে উদ্যত হবে। তাই নিজ শিশুটির প্রয়োজনে তাকে টিকা দিন। এরই মধ্যে যেসব শিশু টিকার আওতায় এসেছে, তাদের পুনরায় বুস্টার ডোজ দেওয়া হচ্ছে। দেশ ও দশের প্রয়োজনে সরকারিভাবে এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানানো আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।
এই সংকটময় পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাচ্চাকে বড় কোনো জমায়েতে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসক বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন। শিশুর রোগ প্রতিরোধ বাড়াতে এবং তাকে সঠিক চিকিৎসা দিতে কী করতে হবে–সেরে নিতে পারেন সেই প্রাথমিক পরামর্শও। আর কাউন্সেলিং সহায়তা তো থাকছেই।
সরকারি টিকাদান কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে নিজ উদ্যোগে কাছের টিকাকেন্দ্রে গিয়ে শিশুকে টিকা দিন। নিজে সচেতন হোন, তবেই সুরক্ষিত থাকবে আপনার শিশু।
লেখক : অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, স্কয়ার হাসপাতাল

