এত বড় সিদ্ধান্ত আচমকা কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেক সময় সাধারণকে জানানো হয় প্রতিক্রিয়া বুঝতে বা খানিকটা সময় নিতে। নতুন সরকার ১৮০ দিনে যত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম অর্থবছরের টাইমফ্রেম বদলানো। বিষয়টি এতটাই নীরবে হয়েছে যে, মূলধারার মিডিয়াগুলো টেরই পায়নি।
ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করার আগে এর প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়াজ তোলা হয়েছিল। র্যাব গঠনের আগেও সরকারের ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের বহু সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে। কিন্তু জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ হবে অর্থবছর— এ সিদ্ধান্ত আচমকা। ঠিক যেন মন্ত্রিসভার ডে লাইট সেভিংস সিস্টেমের সিদ্ধান্তের মতো।
সিদ্ধান্তটি নিয়ে এখন স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা হচ্ছে— এতে কী সুবিধা হবে, কী অসুবিধা হতে পারে। অর্থবছর শুধু একটি ক্যালেন্ডার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড়, কেনাকাটা, ঠিকাদারি এবং জনগণের অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা। তাই জুলাই-জুন বদলে এপ্রিল-মার্চ করলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে— এমন ধারণা কিছুটা সরলীকরণ হয়ে যায়।
অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, অবকাঠামোবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো অর্থবছরের শেষ সময়ে অর্থাৎ জুন মাসে বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করে। জুলাই-আগস্টে বাড়তি কাজের প্রবণতা দেখা যায়। বর্ষায় কাজ দীর্ঘায়িত হয়, মানও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। নগরজীবনে আসে ব্যাপক জনদুর্ভোগ। এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করা হলে বর্ষার আগেই অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করা যাবে। এসব যুক্তি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমাদের অবকাঠামোগত কাজের বড় অংশই আবহাওয়া ও বর্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অর্থবছর এমনভাবে সাজানো দরকার— যাতে বর্ষার সময় প্রস্তুতি ও দরপত্রের কাজ শেষ করে অনুকূল মৌসুমে মাঠপর্যায়ের কাজ করা যায়, যা এতদিন ছিল। জুলাই-আগস্টে প্রস্তুতি ও দরপত্রের কাজ করে সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কাজ চালানোর সুযোগ থাকে। জুনে হিসাবনিকাশ সাঙ্গ করা যায়। অর্থাৎ বর্তমান অর্থবছরের কাঠামোটি নিছক কোনো প্রশাসনিক অভ্যাস নয়; বাংলাদেশের জলবায়ু ও কাজের মৌসুমের সঙ্গেও এর একটি সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থবছর পরিবর্তন তাই শেষ কথা নয়, শুরু। সবচেয়ে বড় কথা, অর্থবছরকে ‘টাকা খরচের সময়সীমা’ হিসেবে না দেখে ‘কাজ শেষ করার সময়সীমা’ হিসেবে দেখতে হবে
এ যুক্তির ঐতিহাসিক ভিত্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত অর্থবছর ছিল এপ্রিল-মার্চ। পরে বাংলার বর্ষার চরিত্র বিবেচনায় নিয়েই তা থেকে সরে আসেন আইয়ুব খান। সেই থেকে জুলাই-জুন সময়কাল অর্থবছর। ১৮৬৭ সাল অর্থাৎ ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর। অস্ট্রেলিয়া, মিসর, পাকিস্তান, কেনিয়াসহ অনেক দেশই জুলাই-জুন অর্থসাল। তবে প্রশাসনিক সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-নিউজিল্যান্ড অর্থবছর বদল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জুলাই-জুনকেই অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করত। ১৯৭৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল সরকারের অর্থবছর হিসেবে অক্টোবর-সেপ্টেম্বরকে ব্যবহার করে আসছে। যুক্তরাজ্য ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করছে। যদিও তাদের করবর্ষ ৬ এপ্রিল থেকে ৫ এপ্রিল।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২-এর (১) অনুচ্ছেদে অর্থবছর শুরুর দিন হিসেবে ১ জুলাইয়ের কথা বলা আছে। কাজেই সংবিধানও বদলাতে হবে। প্রযুক্তিগত বদল আনতে হবে আইবাস++ সিস্টেম, ট্রেজারি চালান, পে-রোল, পেনশন সিস্টেম, কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে।
২০১২-২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় অর্থবছরের টাইমফ্রেম বদলানোর আলোচনা ছিল। সংসদেও আলোচনা হয়েছিল। অর্থবছরের সময়সীমা বদলালে সরকারি কাজের গতি কি সত্যিই বাড়বে? একটি প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর প্রকল্প বাছাই, নকশা, দরপত্র, মূল্যায়ন, চুক্তি— এসবে দীর্ঘ সময় চলে যায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস কেটে যায় প্রস্তুতিতেই। কাজ শুরু হয় অনেক দেরিতে। অর্থবছরের শেষদিকে এসে তখন শুরু হয় তাড়াহুড়ো করে টাকা খরচের প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ সমস্যা যদি হয় কাজ শুরু করতে দেরি করা— তাহলে অর্থবছর বদলে সমস্যাটিকে অন্য একটি সময়ের ঘরে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে মাত্র।
বরং অর্থবছর বদলের একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হলো, কাজের মৌসুম ও অর্থবছরের সীমারেখা যদি পরস্পরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থবছর শেষ হওয়ার কারণে বরাদ্দের টাকা দ্রুত খরচ করার চাপ তৈরি হলে মানসম্পন্ন কাজের বদলে ‘টাকা খরচ হয়েছে’— এ হিসাবটাই বড় হয়ে উঠতে পারে। আর সেখানেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। ঠিকাদার-প্রকৌশলীর অনৈতিক সমঝোতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এটি কোনো অনিবার্য ফল নয়; কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নজরদারি থাকলে ঝুঁকিটি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
তাহলে কি অর্থবছর পরিবর্তন করা উচিত নয়? প্রশ্নটি এত সরল নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— অর্থবছর বদলের পাশাপাশি অর্থ ব্যবস্থাপনার কোন কোন সংস্কার করা হচ্ছে?
এখানে বাজেট ছাড়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফান্ড রিলিজ প্রসিডিউর রয়েছে এবং বাজেট প্রণয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক বিধি ও নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর অর্থ ব্যবহারে দেরির প্রতিটি দায় অর্থ বিভাগের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কোথায় অনুমোদনের সমস্যা, কোথায় প্রশাসনিক বিলম্ব, কোথায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা— সেগুলো আলাদা করে দেখা দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেট শৃঙ্খলা। সংসদ যে অর্থ অনুমোদন করে, তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি সংসদেরও দায়িত্ব। অর্থবছরের শেষে সংশোধিত বাজেট পাস করার চেয়ে ব্যয়ের বিচ্যুতি আগেই শনাক্ত করা বেশি কার্যকর। কারণ টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন তোলা আর টাকা খরচের আগে প্রশ্ন তোলার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
এখানে আমাদের সংসদীয় জবাবদিহির কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে। অর্থাৎ অর্থবছর পরিবর্তনের বিতর্ককে শুধু ‘জুলাই-জুন না এপ্রিল-মার্চ’— এ দুই বিকল্পের মধ্যে আটকে রাখলে আসল আলোচনাটি আড়ালে পড়ে যাবে।
পরবর্তী অর্থবছরে কী কাজ হবে, তার পরিকল্পনা আগের অর্থবছরেই শেষ করা যায়। প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান আগে করা যায়। প্রকল্পের নকশা ও দরপত্রের প্রস্তুতি আগেই নেওয়া যায়। অর্থ বিভাগের নথিপত্রেও প্রতি বছর বাজেট প্রাক্কলন ও পরবর্তী কয়েক বছরের বাজেট প্রক্ষেপণের প্রক্রিয়া রয়েছে। তাহলে অর্থবছর শুরু হওয়ার পরই কেন সব কাজ শুরু হবে? এ প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু ক্যালেন্ডার পাল্টালে লাভ কতটা হবে, সেটিই বরং বড় প্রশ্ন।
অর্থবছর পরিবর্তন তাই শেষ কথা নয়, শুরু। সবচেয়ে বড় কথা, অর্থবছরকে ‘টাকা খরচের সময়সীমা’ হিসেবে না দেখে ‘কাজ শেষ করার সময়সীমা’ হিসেবে দেখতে হবে। না হলে জুলাই-জুন বদলে এপ্রিল-মার্চ হবে; কিন্তু সেই একই পুরনো প্রশ্ন থেকে যাবে— টাকা ছিল, বরাদ্দ ছিল, প্রকল্প ছিল; কাজ হলো না কেন? ক্যালেন্ডার বদলানো সহজ। অর্থ ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি বদলানোই আসল কঠিন কাজ।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়






