একজন সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী

ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার (১ ডিসেম্বর ১৯৩১-১২ জুলাই ২০২৬)
ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার শুধু একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বলনক্ষত্র। ছয় দশকের বেশি সময়— প্রায় ৬৬ বছর তিনি আদালতে আইনচর্চা করেছেন। কিন্তু সময়ের দীর্ঘতা নয়, তার ব্যক্তিত্ব, পেশাগত সততা, শিষ্টাচার ও আদর্শই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ব্যারিস্টার। ব্রিটিশ ব্যারিস্টারদের যে সৌন্দর্য, সৌকর্য ও পেশাদারিত্বের ঐতিহ্য— তিনি সারাজীবন তা ধারণ করেছিলেন। তার নিখুঁত থ্রি পিস স্যুট, টাই, হ্যাট, হাতে ছড়ি, ঘড়ি— সব মিলিয়ে তিনি যেন সুপ্রিম কোর্টের করিডরে এক চলমান ইতিহাস ছিলেন। আজও চোখ বন্ধ করলে তার সে রাজকীয় অথচ মার্জিত উপস্থিতি ভেসে ওঠে। পুরো সুপ্রিম কোর্টে তার মতো ব্যক্তিত্ব আর কাউকে দেখিনি।
আমার প্রায় ৩৪ বছরের আইনজীবী পেশায় তাকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। তিনি ছিলেন অসাধারণ মৃদুভাষী, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল। কারও সঙ্গে উচ্চ স্বরে কথা বলতেন না। আদালত, চেম্বার কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনে— সব জায়গায়ই তিনি ছিলেন একই রকম সংযত ও ভদ্র।
তার চেম্বারে গেলে তিনি যে আন্তরিকতায় আমাদের বরণ করে নিতেন, তা আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। হাসিমুখে বলতেন, ‘কী খোকন, কী খাবা? কফি খাবে? এই, বিস্কুট নিয়ে আসো। খোকন, বিস্কুট খাও।’ এত বড় একজন মানুষ অথচ স্নেহ-ভালোবাসায় তিনি আমাদের আপনজনের মতো করে কাছে টেনে নিতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে খুবই শ্রদ্ধা করতাম ও ভালোবাসতাম। আমার বিশ্বাস, তিনিও আমাকে স্নেহ করতেন।
আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। আদালতে তার যুক্তি উপস্থাপনের ধরন, আইনের বিশ্লেষণ এবং বক্তব্য উপস্থাপনের শিল্প ছিল অসাধারণ। বিচারপতিরাও গভীর মনোযোগ দিয়ে তার সাবমিশন শুনতেন। অনেক বিচারপতি তার বক্তব্য থেকে শেখার চেষ্টা করতেন। তার বক্তব্যে ছিল যুক্তির দৃঢ়তা, ভাষার সৌন্দর্য এবং অভিজ্ঞতার গভীরতা।
ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী। লোভ, ক্ষমতার মোহ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ কোনোদিন তার আদর্শকে স্পর্শ করতে পারেনি। নীতি-নৈতিকতা থেকে তার বিচ্যুতি কখনো ঘটেনি
আমি দীর্ঘ ২০-২২ বছর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে কাজ করেছি। তবে সে সময় কয়েকটি মামলায় ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার স্যারকে সহায়তা করার সুযোগ হয়েছিল। আজও একটি ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় ১৫-২০ বছর আগে নর্দান বেঙ্গলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তাকে এনগেজ করা হয়েছিল। আমি মামলার ফাইলটি তার হাতে দিতেই তিনি পুরো ফাইলটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। প্রথম পৃষ্ঠা, উল্টো পৃষ্ঠা, শেষ পৃষ্ঠা— প্রতিটি জায়গায় নিজ হাতে গুরুত্বপূর্ণ নোট নিলেন।
আজকের দিনে এমন নিষ্ঠা খুব কমই দেখা যায়। অধিকাংশ সিনিয়র আইনজীবী তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার প্রতিটি মামলাকে নতুন করে অধ্যয়ন করতেন। পরে মামলার যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো প্রশ্ন করা হলে তিনি নির্ভুলভাবে উত্তর দিতে পারতেন। এটিই ছিল তার অসাধারণ মেধা, প্রস্তুতি এবং দায়িত্ববোধ।
রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় লন্ডনে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। জাগোদলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিএনপির জন্ম, দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ পথচলা— সবকিছুর সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারেও মন্ত্রী ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক সংকটের এক কঠিন সময়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে কঠিন সময় তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সামলে ছিলেন। তার ওপর বেগম খালেদা জিয়ার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল।
তিনি নীতির সঙ্গে কখনো আপস করেননি। রাজনীতিতে কত উত্থান-পতন, কত দলবদল, কত বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছি। কিন্তু ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী। লোভ, ক্ষমতার মোহ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ কোনোদিন তার আদর্শকে স্পর্শ করতে পারেনি। নীতি-নৈতিকতা থেকে তার বিচ্যুতি কখনো ঘটেনি।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের বহু নির্বাচনে তিনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। ভোটগ্রহণ শেষে ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত— গভীর রাত, কখনো কখনো রাত ৩টা পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতেন। তার বয়সী অন্য কাউকে এত ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি। আইনজীবীদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল সত্যিই অসাধারণ।
পার্লামেন্টেও তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় তার দক্ষতা ছিল অসামান্য। আমি তখন সংসদ সদস্য ছিলাম না; কিন্তু টেলিভিশনে তার অধিবেশন পরিচালনা দেখতাম। তার শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা ও রসবোধ সংসদকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। পরে সংসদ সদস্য হিসেবে তার বক্তৃতাগুলোও শুনেছি। প্রতিটি বক্তব্য ছিল পরিমিত, তথ্যসমৃদ্ধ ও ক্ল্যাসিক।
একদিন নির্বাচনের আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘খোকন, আমি তো আর সামনের নির্বাচন করব না। আমার ছেলেটা যেন নির্বাচন করতে পারে, তোমরা খেয়াল রেখো।’ কথাটি তিনি কয়েকবার বলেছিলেন। একজন বাবার স্বপ্ন ছিল, তার উত্তরসূরি যেন জনগণের সেবা করার সুযোগ পায়। আল্লাহ তাকে সে স্বপ্নপূরণ হতে দেখার সৌভাগ্য দিয়েছিলেন। জীবিত অবস্থাতেই তিনি দেখেছেন, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার সুযোগ তার ছেলে পেয়েছেন।
তিনি ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয় একজন রাজনীতিবিদ। পঞ্চগড়, বগুড়া, ঢাকা— দেশের বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচন করে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তার জনপ্রিয়তার মূল শক্তি ছিল সততা, সরলতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। আমাদের দেশে অনেকেই নিজেকে সৎ দাবি করেন; কিন্তু সত্যিকারের সততা মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার সেই বিরল মানুষদের একজন, যাকে মানুষ নিজেরাই সৎ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি কখনো কারও ক্ষতি করতে চাইতেন না। ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক, নির্মল ও নিষ্পাপ মনের মানুষ। তার কাছ থেকে আমি শিখেছি— সরল মানুষকে মানুষ ভালোবাসে, বিশ্বাস করে। জনপ্রিয়তা অর্থ কিংবা ক্ষমতা দিয়ে অর্জিত হয় না; মানুষের হৃদয় জয় করতে হয় সততা ও বিনয় দিয়ে। তিনি নিজেই ছিলেন জীবন্ত উদাহরণ।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আদালতের করিডর, সুপ্রিম কোর্টের বারান্দা, সংসদের ইতিহাস, জাতীয় রাজনীতি—সবখানেই তার পদচিহ্ন অমলিন হয়ে থাকবে। তার চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি বাংলাদেশের আইনাঙ্গন, রাজনীতি এবং জাতীয় জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি।
এমন মানুষ খুব কমই জন্ম নেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রাজ্ঞ আইনজীবী, আদর্শ রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংসদ নেতা, স্নেহময় অভিভাবক এবং সর্বোপরি একজন অসাধারণ মানুষ। আমি মহান আল্লাহর কাছে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমিন।
লেখক: সংসদ সদস্য, ব্যারিস্টার ও সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন





