বুদাপেস্টে পরিবর্তনের হাওয়া
ওরবানের পরাজয়ে ইউরোপে বন্ধুহীন পুতিন-ট্রাম্প

পরাজয় মেনে নিয়ে সমর্থকদের দেশের কাজ করার আহ্বান করেন ভিক্টর ওরবান। ছবি : আলজাজিরা
পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন হাঙ্গেরির জনগন। হেরে গেছেন ভিক্টর ওরবান। যিনি ছিলেন একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
১৬ বছর পর বুদাপেস্টের শাসনক্ষমতা হারালেন ওরমান। তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন পিটার ম্যাগিয়ার। যিনি একসময় ছিলেন ওরবানের কট্টর সমর্থক।
স্থানীয় সময় রোববার অনুষ্ঠিত হয় ভোট। মধ্যরাতে আংশিক ফলাফলে দেখা গেছে, বড় জয় পেতে যাচ্ছে ম্যাগিয়ারের তিসা পার্টি। ১০৬টি আসনের মধ্যে ৯৫টিতেই এগিয়ে রয়েছে দলটি। ধারণা করা হচ্ছে, ১৯৯ আসনের সংসদে ১৩০টির বেশি আসন পেতে পারে তিসা।
হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচন দপ্তর জানিয়েছে, নির্বাচনে ৭৭ শতাংশের বেশি পড়েছে ভোট। কমিউনিস্ট শাসন থেকে বের হবার পর এটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
গণনা করা ভোটের ফল অনুযায়ী, তিসা পার্টির ৫২.৪৯ শতাংশের বিপরীতে ওরবানের ফিদেস পার্টি পেয়েছে ৩৮.৮৩ শতাংশ ভোট।
রোববার গভীর রাতে সামাজিকমাধ্যমে মাগিয়ার সমর্থকদের জানান, আমাদের বিজয়ের জন্য ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান।
অন্যদিকে, পরাজয় মেনে নিয়ে ওরবান উল্লেখ করেছেন, আমি অভিনন্দন জানিয়েছি বিজয়ী দলকে। ফলাফলটি বেদনাদায়ক হলেও স্পষ্ট। সরকার গঠনের আমাদের দেয়া হয়নি দায়িত্ব।
বিরোধী দল হিসেবে ফিদেজ পার্টি দেশের সেবা করে যাবে বলে উল্লখ করেন ওরবান।
পরাজয়ের কারণ
দেড় দশকের মধ্যে এবারই প্রথম এবং বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হলেন ওরবান। জরিপগুলোর দাবি ছিলো, ওরবানের স্থিতিশীলতার বদলে মানুষ পরিবর্তনের জন্য আগ্রহী।
ভোটের আগে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন হাঙ্গেরিয়ান ভোটার বোগনারের।
বছরের পর বছর ধরে ওরবানকে ভোট দিয়েছেন বোগনার। এবার তার নিজ শহর সুমেগেতে প্রতিপক্ষের জন্য প্রচার চালিয়েছেন তিনি। এটি ফিদেজের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি।
বোগনারের দাবি, স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা ভালো নয়, ওষুধ কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন। তার ভাষ্য, দেশের পরিবর্তন দরকার। যদি পরিবর্তন না আসে, গৃহযুদ্ধও হতে পারে।
অনুমান করা হচ্ছে, বোগনারের মতো অধিকাংশ একই মত নিয়ে ভোট দিয়েছেন ম্যাগিয়ারকে।
ওরবানের পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সমর্থনে প্রচারণার শেষ সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সফর করেন বুদাপেস্ট।
কিন্তু অনুমান করা হচ্ছে, এতেও জনসমর্থন বাড়েনি ফিদেজ পার্টির। বরং, ইরান যুদ্ধের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় হতাশ হাঙ্গেরিয়ানরা। হোয়াইট হাউসের এ সমর্থন আরও কমিয়ে দিয়েছে আরবানের ভোট।
ওরবানকে বন্ধু হিসেবে দেখে রাশিয়াও। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) চরম আপত্তি সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিল আটকে দিতে নিয়মিতভাবে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন তিনি।
মনে করা হচ্ছে, ইইউ এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ওরবানের অবস্থান তার পরাজয়ের বড় কারণ।
বোগনার হতাশার সুরে জানিয়েছেন, এই সরকারের ওপর সবাই ভীষণ ক্ষুব্ধ। রাশিয়া বা আমেরিকার সঙ্গে আমাদের জোট বাঁধার কোনো প্রয়োজন নেই, আমাদের স্থান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে।
ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ব্রাসেলসের আটকে রাখা ১৮ বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ম্যাগিয়ার। বুদাপেস্টের স্বেচ্ছাচারী শাসন ও দুর্নীতির জন্য এ তহবিল আটকে রেখেছে আঞ্চলিক সংস্থাটি।
ওরবানের বন্ধু ইভা কাটোনা-কোভাচের ব্যাপক দুর্নীতিকে সমর্থকদের দল ছাড়ার আরও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বোগনার।
২০২৪ সালে দেশের বিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি এবং শিশু নির্যাতনের একটি মামলায় রাষ্ট্রপতির বিতর্কিত ক্ষমা ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে আলোচনায় আসেন পিটার ম্যাগিয়ার। ধারনা, এ আন্দোলনের মাধ্যমে পাওয়া জনপ্রিয়তা কাজে লেগেছে ভোটে।
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রভাব
শুধু হাঙ্গেরি নয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ইউক্রেন যুদ্ধে প্রভাব ফেলবে ওরবানের পরাজয়।
পিটার ম্যাগিয়ার মধ্য-ডান ও ইইউপন্থি নেতা। এর ফলে সম্ভবত ইইউর সঙ্গে বৈরি ভূমিকার অবসান ঘটবে বুদাপেস্টের।
পথ খুলে যাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের জন্য ৯০ বিলিয়ন ইউরো (১০৫ বিলিয়ন ডলার) ঋণ পাওয়ার। যা ভোটো দিয়ে আটকে রেখেছিলেন ওরবান।
আশা করা হচ্ছে, হাঙ্গেরি আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে পশ্চিম ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গে। আবারও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মূলধারায় চলে আসবে বুদাপেস্ট।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইইউতে তার প্রধান মিত্র থেকে বঞ্চিত করবে ওরবানের পরাজয়। ইউরোপে ওরবানের মতো প্রিয় বন্ধুর নৈতিক সমর্থন হারাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।
তবে, ওরবানের রেখে যাওয়া নীতি সংস্কারের জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিততে হবে তিসাকে। সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না করতে এসব কাজে জটিলতায় পড়বেন ম্যাগিয়ার।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত, ভাষান্তর মাহমুদুল হাসান রিফাত
















