শিক্ষা সংস্কারে নতুন দিগন্ত : উন্নত জাতি গঠনের রূপরেখা

ফাইল ছবি
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে। তবে, এ অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে এবং একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি আধুনিক, মানবিক ও উদ্ভাবনী প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত শিক্ষা ভাবনা এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। এ ভাবনার মূল নির্যাস হলো একটি যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা রূপান্তর কৌশল, যা কেবল সনদধারী শিক্ষার্থী নয় বরং দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রথমত, একটি জাতির সফলতার মূল ভিত্তি রচিত হয় তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের মধ্যে যে গুণগত বৈষম্য বিদ্যমান, তা নিরসন করা এই মহাকৌশলের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরে আনন্দময় এবং অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষার চাপে শিশুর সৃজনশীলতা যেন রুদ্ধ না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে প্রণয়ন করতে হবে আধুনিক পাঠ্যক্রম। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে তাদের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। শিক্ষার এই প্রাথমিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে পরবর্তী ধাপগুলোয় সহজেই নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে শিক্ষার্থীরা।
দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতার বিকাশ নিশ্চিত করা এ সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা এতদিন মূলত চাকরিপ্রত্যাশী তৈরি করেছে, তবে, কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে। এই সংকট উত্তরণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত করা অপরিহার্য। কেবল উচ্চশিক্ষার সনদের পেছনে না ছুটে তরুণ প্রজন্মকে বাস্তব জীবনের উপযোগী বিভিন্ন কারিগরি বিদ্যায় পারদর্শী করে তুলতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী শিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন করলে শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এর ফলে দেশের শ্রমশক্তি দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উৎপাদনশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে।
তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের গণ্ডি থেকে বের করে পরিণত করতে হবে জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইন্ডাস্ট্রি এবং অ্যাকাডেমিয়া অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব। বিশেষ করে কৃষি উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোয় উচ্চতর গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশেই তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ পাবে এবং উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে মেধাপাচার।
চতুর্থত, শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানো এ ভাবনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক। একটি উন্নত জাতি গঠনে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয় বরং সততা, মানবিকতা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নাগরিক প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থায় এই নৈতিক উপাদানগুলোর সঠিক সংযোজন দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এর পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক অনিয়মের মতো ব্যাধিগুলো দূর করতে কার্যকর জবাবদিহি প্রবর্তন করতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত এই শিক্ষা ভাবনা একটি সুদূরপ্রসারী মহাকৌশল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। তবে, এ রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে সফল করতে হলে প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নীতিনির্ধারণী ধারাবাহিকতা। শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের বৈষম্য দূর করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কাঠামোই পারে আগামীর বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সব অংশীজনের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ স্বপ্ন সার্থক হবে এবং একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ লাভ করবে আগামী প্রজন্ম।
লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



