জুলাই–আগস্টে নিউইয়র্ক হয়ে যায় এক টুকরো বাংলাদেশ

ছবি: আগামীর সময়
জুলাই ও আগস্ট এলেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে যেন ফিরে আসে বাংলাদেশের আবহ। কর্মব্যস্ত প্রবাসজীবনের মাঝেও এই দুই মাস বাঙালিদের জন্য হয়ে ওঠে মিলন, আনন্দ ও শিকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার সময়। পার্কের সবুজ প্রান্তর, পরিবার-পরিজনের উপস্থিতি আর দেশীয় সংস্কৃতির আয়োজনে দূর আমেরিকার মাটিতেই যেন গড়ে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বনভোজন ও মিলনমেলার মৌসুমও শুরু হয়। জুলাইয়ের শুরু থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এসব অনুষ্ঠান। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে এই সময়টুকুই পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আনন্দ করার সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে ওঠে।
সন্তানদের ছুটি, পরিবারের অবসর এবং স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ মিলিয়ে এই সময়টি প্রবাসীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সারা বছরের ব্যস্ততায় যাদের সঙ্গে দেখা বা আড্ডার সুযোগ হয় না, বনভোজনের আয়োজন তাদের আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে। ফলে জুলাই ও আগস্ট শুধু দুটি মাস নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এটি সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও শিকড়ের টানকে নতুন করে অনুভব করার সময়।
নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জেলা সমিতি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এসব বনভোজন ও মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। যেখানে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি রয়েছে, সেখানেই এই সময় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিটি আয়োজনেই থাকে গান, নাচ, কবিতা, শিশুদের খেলাধুলা, বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিচারণ এবং বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন আয়োজন। দেশীয় খাবারের পরিবেশনে প্রবাসের দূরত্ব অনেকটাই ভুলে যান অংশগ্রহণকারীরা। একই জেলার মানুষের পাশাপাশি অন্য জেলার বাংলাদেশিরাও এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
একসময় এ ধরনের আয়োজন মূলত নিউইয়র্ককেন্দ্রিক ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃতির পাশাপাশি বনভোজনের আয়োজনও ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে। এখন জুলাই–আগস্ট মানেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলার মৌসুম।
কুমিল্লা সমিতির সভাপতি ইউনুস সরকার বলেছেন, ‘প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় আমরা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাই। বনভোজন ও মিলনমেলা আমাদের আবার একত্র হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এখানে শুধু আনন্দ নয়, নতুন সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পুরোনো সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। আমাদের সন্তানদের জন্যও এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। তারা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা চাই প্রতিবছর এই আয়োজন আরও বড় পরিসরে হোক। প্রবাসে থেকেও নতুন প্রজন্ম যেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কমিউনিটি অব নর্থ আমেরিকা ইনকের সভাপতি আনোয়ার হোসেন তালুকদার সপন বলেছেন, ‘এটি শুধু একটি পিকনিক নয়, আমাদের আবেগের প্রকাশ। এখানে শুধু আমাদের জেলার মানুষ নন, বিভিন্ন জেলার বন্ধুরাও অংশ নেন। সবাই মিলে একটি দিন আনন্দের সঙ্গে কাটাই এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করি। আমরা চাই প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠুক।’
গ্রেটার ময়মনসিংহ অ্যাসোসিয়েশন অব পেনসিলভানিয়া ইনকের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা সারা বছর এই সময়টির জন্য অপেক্ষা করি। বাচ্চাদের স্কুল ছুটি থাকায় সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। বছরের অন্য সময়ে ব্যস্ততার কারণে দেখা হওয়ার সুযোগ কম থাকে। কিন্তু এই বনভোজন আমাদের আবার এক জায়গায় নিয়ে আসে। সবাই মিলে আনন্দ করি, গল্প করি এবং পুরোনো স্মৃতি ভাগাভাগি করি। এই আয়োজন আমাদের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।’
প্রবাসজীবন মানুষকে দেশ থেকে দূরে রাখলেও শিকড়ের টান মুছে দিতে পারে না। ভাষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক বন্ধনই বারবার মানুষকে আপনজনের কাছে ফিরিয়ে আনে। তাই জুলাই–আগস্টের বনভোজন শুধু একটি সামাজিক আয়োজন নয়; এটি প্রবাসে বাংলাদেশি পরিচয়, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক প্রাণবন্ত উৎসব, যেখানে হাজার মাইল দূরে থেকেও খুঁজে পাওয়া যায় নিজের দেশের আবহ।






