ইউরোপে বিএনপির নেতৃত্ব দুর্বল, ভয় লীগের তৎপরতা নিয়েও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন কমিটি না থাকা আর ক্ষমতায় এসে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাংগঠনিক উদাসীনতা ও ততপরতা না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে একসময়ে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক ইউনিট ইউরোপ । শুধু ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানিই নয়, সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বসবাস ইতালি, স্পেন, গ্রিসেও নেই বিএনপির কমিটি।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ১১ অক্টোবর বার্লিন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনি এই সম্মেলনে অংশ নিলেও ঢাকা ও জার্মানিতে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসেরও এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। ড. ইউনূসের আগমনকে কেন্দ্র করে জার্মানিতে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নামে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ড. ইউনূসকে বক্তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়।
জার্মানিতে থাকা বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডা. জোবায়দা রহমান বার্লিনে আসবেন এটা তারা জানলে এয়ারপোর্টে বিক্ষোভ করতেন। তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু ড. ইউনূস না আসায় তারা বার্লিন থেকে আগেই ফিরে যান।
আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
জানা গেছে, সম্প্রতি বিএনপি সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তারা সরকারি সফরে জার্মানি, সুইডেন, ইতালি ও ডেনমার্কে আসলেও তাদের সফরে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দেশের বিএনপি নেতারা। দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে না পারাকে সাংগঠনিক ব্যর্থতা বলছে বিএনপির নেতারা।
ইউরোপের একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকলেও জার্মানিসহ ইউরোপে বিএনপির অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। এখন প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারেন। তাই সংগঠন গোছানো ও নেতৃত্ব তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অদৃশ্য বাধার কারণে ইউরোপের নেতাদের কার্যক্রম করতে দেওয়া হচ্ছে না।
জার্মানি বিএনপির নেতারা জানান, ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক সংকটের সময় জার্মানির মানহাইম থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রথম টেলিফোন কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় দলের সংকট, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংস্কারপন্থীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয় ও ইউরোপের নেতারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানান। এ ছাড়া শেখ হাসিনা ইভিএম চালুর সিদ্ধান্ত নিলে, জার্মানি থেকেই প্রথম ইভিএমে ভোট কারচুপির প্রমাণ তুলে ধরা হয়। জার্মানির সেই সেমিনারে দেওয়ান শফিকুল ইসলাম বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সামনে ভোট কারচুপির প্রমাণ তুলে ধরেন। অথচ জার্মানিতেই এখন দীর্ঘদিন কমিটি নেই। জাতীয় নেতারা জার্মানি সফর করলে নেতা-কর্মীদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় নেতাদের প্রাপ্ত সম্মান দিতে পারেন না।
জার্মানি বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং দলের ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য দেওয়ান শফিকুল ইসলাম বলেন, জার্মান বিএনপিকে শক্তিশালী করতে হলে একটি শিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞ, যোগ্য এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গঠন করতে হবে। এমন নেতৃত্ব, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত বিভাজন ও অযৌক্তিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দলের আদর্শ, বাংলাদেশের কল্যাণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেবেন।
দেওয়ান শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, জার্মানিসহ ইউরোপে পতিত আওয়ামী লীগের গুজববাজ নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলছেন ডা. জুবায়দা রহমান নাকি গোপনে বার্লিন সফর করেছেন। ইউরোপে আমরা বিএনপির কর্মীরা জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শের ধারক। আমাদের দলের প্রধানের স্ত্রী বা দলের মন্ত্রী এমপিদের ইউরোপে হেনস্থার চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করব। তবে জুবায়দা রহমানের জার্মানি সফরকে ঘিরে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে না পারাটা আমাদের জন্যও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দলের নেতাকর্মীদের কাছে এ জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুইেডন বিএনপির সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ঝিন্টু বলেন, এক সময় ইউরোপে আওয়ামী লীগকে আমরা প্রতিহত করেছি। সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্ব আমাদের সেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর এখন দল ক্ষমতায় কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশেই বিএনপির কমিটি নেই। দলের মধ্যে কোন্দল। বিএনপির ইউরোপের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নেতা রয়েছেন, তিনি থাকেন লন্ডনে। আমরা দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি, আমরা সবাই দেশে যাব শিগগিরিই। এভাবে সংগঠন চলতে পারে না। আমরা দেশে গিয়ে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে বসব।
নরওয়ে বিএনপির সভাপতি বাদল ভূইয়া বলেন, এই মূহুর্তে ইউরোপে বিএনপির কর্মীর অভাব নেই। প্রয়োজন শক্তিশালী সংগঠন। আর এই সংগঠনের জন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। সামনের নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীরা ভোট দিতে পারবেন। এটা মাথায় রাখতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি বলেননি। তবে সম্প্রতি তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, অতি দ্রুত জার্মানি ও ইতালির রাজ্যগুলোতে কমিটি দেওয়া হবে। পরে সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের কমিটি ঘোষণা করা হবে।



