চাকরির স্বপ্নে কম্বোডিয়া, ফিরলেন ক্ষত নিয়ে
- অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ
- পাসপোর্ট-টাকা কেড়ে নিয়ে নির্যাতন
- উচ্চ বেতনে ফাঁদে নারী পাচার
- পাচারচক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তার

ছবি: এআই নির্মিত
রাজবাড়ীর মেয়ে রিনা (ছদ্মনাম)। চেয়েছিলেন পরিবারের অভাব ঘোচাতে। স্বপ্ন দেখেছিলেন বিদেশে গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করবেন। ঋণ শোধ করবেন, স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় এক ভয়াবহ ফাঁদে। স্বপ্ন পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে পাচারের পর পাসপোর্ট ও অর্থ কেড়ে নিয়ে তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোর করে কাজ করানো হয়। এমনকি বাধ্য করা হয় বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডেও। অস্বীকৃতি জানালে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশে ফিরতে চাইলে দেওয়া হয় প্রাণনাশের হুমকি এবং অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার ভয়। অবশেষে আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহযোগিতায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন ওই নারী। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মো. রুবেলকে (২৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বৃহস্পতিবার বিকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে সংস্থাটির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানিয়েছেন, সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) ইউনিট গত ২১ জুলাই বিকালে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। রুবেল রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার খাগজানা গ্রামের মো. সিরাজের ছেলে।মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আর্থিক সংকটের কারণে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ভুক্তভোগী নারী। কিস্তি সংগ্রহের সুবাদে ওই এনজিওতে কর্মরত রুবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে রুবেল তাকে কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেন। বিদেশ যাওয়ার মতো অর্থ না থাকায় রুবেলের পরামর্শে এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নেন ওই নারী। অভিযোগ, ঋণের পুরো টাকাই নিয়ে নেন রুবেল। সংগ্রহ করেন তার পাসপোর্টও। এরপর বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ধাপে ধাপে আরও অর্থ নেন তিনি। ভুক্তভোগী বিভিন্নভাবে ধারদেনা করে রুবেলের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে দুই লাখ টাকা দেন। সব মিলিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ভিসা ও বিমানের টিকিট দিয়ে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন। অভিযোগ, চক্রের সহযোগীরা তার পাসপোর্ট ও সঙ্গে থাকা অর্থ কেড়ে নেয়। এরপর তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে অনিচ্ছাকৃত কাজ করানো হয় এবং তার উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
একপর্যায়ে তাকে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দেশে ফিরতে চাইলে প্রাণনাশ এবং অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভয়, নির্যাতন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে অবশেষে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন ওই নারী। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহযোগিতায় গত ১ জুলাই বাংলাদেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি। দেশে ফিরে সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেন।
মামলার তদন্তে ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্তে কাজ শুরু করে সিআইডির মানবপাচার শাখা। এরই ধারাবাহিকতায় ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থেকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের পর রুবেলকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতের আদেশে তার জবানবন্দিও গ্রহণ করা হয়েছে। জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের অন্যান্য সদস্য, মানবপাচার নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। এই চক্রের মাধ্যমে আরও কোনো বাংলাদেশি একইভাবে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চালাচ্ছে সিআইডি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে না পড়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই করে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।






