স্বপ্ন নিয়ে সাগরপথে ‘মৃত্যুযাত্রা’
- ৩০ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ ৩৮ জনের সন্ধান মেলেনি আজও
- জুনে ফের নৌকা ডুবে নিখোঁজ চার বাংলাদেশি

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকাডুবি— সংগৃহীত
ঢেউ থামেনি ভূমধ্যসাগরের। থামেনি ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নও। কিন্তু সেই স্বপ্নের বিনিময়ে বাংলাদেশের অনেক পরিবারের উঠানে এখন শুধু অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর শোক। কেউ আট মাস ধরে নিখোঁজ ছেলের ফেরার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, কেউ আবার উদ্ধার হওয়া এক তরুণের ফোনে জানতে পারলেন— তার সন্তান আর ফিরবে না।
হবিগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছে ইউরোপের পথ এখন শুধু বিদেশযাত্রার গল্প নয়, এটি হয়ে উঠেছে নিখোঁজ মানুষের তালিকা, প্রতারণার ফাঁদ এবং ভূমধ্যসাগরের অতল জলে হারিয়ে যাওয়া জীবনের নির্মম দলিল।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের অন্তত ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ আরোহীর কোনো সন্ধান মেলেনি আজও। এরই মধ্যে নতুন করে গত জুনে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে আরেকটি রাবারের নৌকা ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন চার বাংলাদেশি। ওই নৌকায় ছিলেন ৪৬ জন। যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। তবে নিখোঁজদের মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে একজনের পরিচয়। তিনি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সীমা সরকারের ছেলে নিবিড় সরকার অভি (১৮)। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সিলেটের বকুল ঋষি, রংপুরের সালাউদ্দিন ও বরিশালের জিয়াউর রহমান।
এ ছাড়া নৌকা থেকে উদ্ধার হয়েছেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের সামাদ তালুকদারের ছেলে ফাহিম তালুকদার, নূর আলী তালুকদারের ছেলে সানি তালুকদার এবং ইউসুফ তালুকদারের ছেলে আবু বকর তালুকদার। দালাল চক্রকে জনপ্রতি ১৩ লাখ টাকা দিয়ে তারা যাত্রা করেছিলেন গ্রিসের উদ্দেশে।
নিখোঁজ অভির মামা বিপ্লব সরকারের ভাষ্য, ছেলে হারানোর শোকে অভির মা সীমা সরকার হয়ে পড়েছেন অসুস্থ। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়েছে।
বিপ্লব সরকারের অভিযোগ, দালালরা কাঠের নৌকায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত রাবারের নৌকায় পাঠানো হয় তাদের। যাত্রার পর পরিবারকে জানানো হয়েছিল, অভি নিরাপদে গ্রিসে পৌঁছেছেন। সেই কথা বলে দালালরা নিয়েছে ১৩ লাখ টাকা। পরে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণের পর জানা যায়, অভি আর বেঁচে নেই।
নতুন এই ট্র্যাজেডির মধ্যেই এখনো অমীমাংসিত রয়েছে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের নিখোঁজের ঘটনা। সেদিন লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে ইতালির উদ্দেশে চারটি নৌকা রওনা দেয়। তিনটি নৌকা নিরাপদে পৌঁছলেও একটির কোনো সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। ওই নৌকায় হবিগঞ্জের অন্তত ৩৮ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জ সদর, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার একাধিক গ্রামের বাসিন্দা।
বাংলাদেশ দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং সম্ভাব্য ডিটেনশন সেন্টারগুলোয় খোঁজ নিয়েও তাদের অবস্থান সম্পর্কে পাওয়া যায়নি কোনো তথ্য।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. রাসেল মিয়া জানালেন, অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করায় তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে না সরকারের কাছে। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হলেও পাওয়া যায়নি কোনো তথ্য। তার ধারণা, নিখোঁজ ব্যক্তিরা সম্ভবত মারা গেছেন সাগরে ডুবে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান মোল্লার মাধ্যমে অনেক তরুণ ১৭-২০ লাখ টাকা দিয়ে চেষ্টা করেন ইউরোপ যাওয়ার। গত আট মাসে অন্তত ৭৫০ জনকে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পাঠানো হয়েছে— হাসান মোল্লার এমন দাবি এবং সমুদ্রপথের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মানব পাচার, হত্যা এবং মরদেহ গুমের অভিযোগে বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ থানায় তিনটি মামলাও হয়েছে। অবশ্য তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযোগ অনুযায়ী মূলহোতারা এখনো অধরা।
দুটি ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।






