১৩শ কোটির আইসিটি প্রকল্প
৩০০ কোটি লুটের পর ১ লাখের ‘লাইফসাপোর্ট’
- নির্বাচনী প্রতিশ্রুত প্রকল্পের ঝক্কি এড়াতে এই টোকেন বরাদ্দ
- নিম্নমানের আইসিটি সরঞ্জাম সরবরাহ
- কেনাকাটায় এবার থাকবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডিজিটাল মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ২০১৬ সালে ১৩শ কোটি টাকার প্রকল্প ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন’ শুরু হয়। কিন্তু শুরুতেই ভুতুড়ে কেনাকাটা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করেই অগ্রিম বিল, প্রশিক্ষণ সনদে জালিয়াতি, নিম্নমানের কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম কেনাকাটায় ৩০০ কোটি টাকা লুট করা হয়। এরপর সে সময়ের আওয়ামী সরকারের উচ্চ মহল থেকে তদন্ত করে অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবার সেই মৃতপ্রায় প্রকল্পটিকে ‘লাইফসাপোর্ট’ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে ঘোষিত বাজেটে ১ লাখ টাকার ‘প্রতীকী বরাদ্দ’ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মৃতপ্রায় প্রকল্পটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টার নেপথ্যে রয়েছে ভিন্নরকম গল্প। পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দেশ জুড়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। যেহেতু আগের এই প্রকল্পের লক্ষ্য সরকারের বর্তমান প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিলে যায়, তাই নতুন প্রকল্প গ্রহণের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও আমলাতান্ত্রিক ঝক্কি এড়াতে এটিকে পুরোপুরি বন্ধ না করে খাতা-কলমে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুবিভাগের নথি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি এ প্রকল্পের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩০ জুন। (এর মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং বরাদ্দ দিয়ে জীবিত রাখা হয়েছে)। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে স্কুলে স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করার। তাই চলমান প্রকল্পটিকে নতুন নামে ও ভিন্ন ফরম্যাটে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. শাহজাহান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অন্যান্য কিছু প্রকল্পের মতো এ প্রকল্পেও টোকেন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু প্রকল্পের মেয়াদ জুনের ৩০ তারিখ শেষ, তাই নতুন করে এই বরাদ্দ দিয়েছি। এতে প্রকল্পটি বাঁচানো সম্ভব। এই কাঠামোর মধ্যে সরকারের নির্বাচনী প্রকল্পের লক্ষ্যগুলোকে সমন্বয় করা যায় কি না, তা বিবেচনাধীন।’
অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে ভেন্যু চার্জ, ইন্টারনেট বিল ও অন্যান্য খাতে অর্থ আত্মসাৎ
প্রকল্প তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার যেহেতু দ্রুত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করতে চায়, সেহেতু নতুন করে প্রকল্প নেওয়া বেশ ঝামেলার। নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি এবং পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পাওয়া দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। প্রকল্পের ১ হাজার ৩৪৭ কোটির মধ্যে এ পর্যন্ত ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, বাকি ১ হাজার কোটি টাকা এখনো কাগজ-কলমে রয়ে গেছে। তাই প্রকল্পটি নতুন করে ‘লাইভ’ করে সংশোধন করতে পারলে আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৭২ হাজার ৮৪০ জন শিক্ষককে আইসিটি প্রশিক্ষণ দেওয়া, ৩৬ হাজার ৮৪টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, ১৫ হাজার ২৭০টি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং ৬ হাজার ৫৯২টি সভা-সেমিনারের আয়োজন করা। কিন্তু কয়েক ধাপ কেনাকাটা শুরু না হতেই নানা অনিয়মের খবর আসতে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম কেলেঙ্কারি ছিল— পিপিআর অনুসরণ ছাড়াই প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি, প্রশিক্ষণ ছাড়াই সনদপত্র দেওয়া ও উপকরণ সরবরাহ না করেই অর্থ তুলে নেওয়া। বিভিন্ন খাতের অর্থ একীভূত করে অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে ভেন্যু চার্জ, ইন্টারনেট বিল ও অন্যান্য খাতে অর্থ আত্মসাৎ। এমনকি প্রশিক্ষণে উপস্থিত না থেকেও কর্মকর্তাদের পকেটে ঢোকে মোটা অঙ্কের সম্মানী।



