বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে প্রতিবাদ ক্যাবের
‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের’ দায় ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না

সংগৃহীত ছবি
দেশের সাধারণ মানুষ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট, তখন নতুন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তন সংক্রান্ত গণশুনানিতে অংশ নিয়ে এ প্রতিবাদ জানায় সংগঠনটি।
ক্যাব জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা আর ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের’ দায় কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির জন্য গত দুদিন ধরে ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে শুনানির আয়োজন করা হয়। প্রথমদিন বুধবার পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলো। সেই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে আনুপাতিকহারে বাড়তি দামও এতে যোগ করার আবেদন জানিয়েছে তারা।
চরম অর্থনৈতিক চাপে সাধারণ মানুষ
বিইআরসিতে দেওয়া লিখিত ও মৌখিক মতামতে ক্যাব উল্লেখ করেছে, বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম সংকটে। এতে আবারও যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তবে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। যা জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা
ক্যাব ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিজস্ব অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং বছরের পর বছর ধরে চলা বিতর্কিত 'ক্যাপাসিটি চার্জের' বোঝা সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এই খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে। আর এর চূড়ান্ত ও নির্মম চাপ বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদেরই, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
ভোক্তাস্বার্থে ক্যাবের ৬ দফা সুপারিশ
গণশুনানিতে ক্যাবের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের সংকট উত্তরণ ও জনস্বার্থ রক্ষায় ৬টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার পূর্ণ সুবিধা না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়; বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সাধারণ ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে এসব খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন; বিদ্যুৎখাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপচয় কমানোর মাধ্যমে ব্যয় হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করারও সুপারিশ করেছে ক্যাব।
আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে ভোক্তা-বান্ধব ও বাস্তবসম্মত মূল্যনীতি প্রণয়নের সুপারিশও করেছে তারা।
বিইআরসির প্রতি আহ্বান
বিইআরসি কেবল কাগজে-কলমে গণশুনানি না করে, দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবে, আশা প্রকাশ করে ক্যাব।






