এ বাজি তদবিরবাজি
সুপারিশের তাপে চাপে নাভিশ্বাস এনবিআরে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)
অতিরিক্ত তদবিরে থমকে গেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) স্বাভাবিক কার্যক্রম। স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। শুধু তা-ই নয়, ঝুলে আছে বিভিন্ন অনিয়মের অডিট রিপোর্টও। এমনকি স্থগিত করতে হয়েছে কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট নিয়োগ পরীক্ষা। আর প্রভাবশালীদের চাপে আটকে গেছে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত পদায়ন। কার সুপারিশ রক্ষা করবে, তা নিয়ে রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে রাজস্ব প্রশাসনে। এনবিআরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
কর্মকর্তাদের শঙ্কা, এমন পরিস্থিতি আর কয়েক মাস চললে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রাজস্ব আদায়ে। পাশাপাশি আছে অর্থনৈতিক মন্দা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের রাজস্ব আহরণের প্রধান প্রতিষ্ঠান এনবিআর। দেশের কর রাজস্বের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই এই সংস্থার মাধ্যমে আদায় হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটির জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যায়।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দরকার কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য এবং সঠিক জায়গায় পদায়ন। কিন্তু সেটা করা যাচ্ছে না। বদলির ফাইল হাতে নিলেই আসছে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন। সে অনুযায়ী কাজ না করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। সবকিছু যেন স্থবির হয়ে গেছে। এই পরিবেশে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন।’
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, স্থানীয় এসব লোকজনের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ না করা হলে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা ঝামেলা এড়াতে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলির চেষ্টা করছেন।
তদবিরের প্রভাব পড়েছে কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষা ঘিরেও। মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের এক দিন পরই তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে স্থগিত করা হয় নিয়োগ প্রক্রিয়া।
জানা গেছে, কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি শাখা থেকে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়— যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রচলিত বিধিমালায় এমন সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, আবেদন যাচাই, পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমির ওপর। পরীক্ষা আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ২ হাজার ৫২১ জন। উত্তীর্ণ হন ২১০ জন। অভিযোগ রয়েছে, ফল প্রকাশের আগে অতিরিক্ত ১১০ জনকে উত্তীর্ণ তালিকায় যুক্ত করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সেই চাপ প্রত্যাখ্যান করায় প্রায় ১৫ দিন আটকে রাখা হয় ফল প্রকাশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর বাজেটের পর জুলাই-আগস্টে এনবিআর কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি হলেও এবার সেটি এখনো শুরু হয়নি। কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, অতিরিক্ত তদবিরের কারণেই আটকে আছে বদলি কার্যক্রম। চলতি মাসে আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কমিশনারদের বদলি-সংক্রান্ত দুটি তালিকা এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের টেবিলে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চমহলের তদবিরের কারণে তিনি এখনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি।
এ ছাড়া তদবিরে আটকে গেছে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন। যুগ্ম কর কমিশনার পদে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৫০টি পদ শূন্য। কিন্তু একই পদের জন্য নানামুখী তদবির আসায় কোন দপ্তরে কাকে পদায়ন করবে, তা নিয়ে এক রকম সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এতে একজন কর্মকর্তাকে তিন থেকে চারটি দপ্তরের কাজ করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই গতিহীন হয়ে পড়েছে রুটিন কার্যক্রম।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযাচিত প্রভাব বা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে কর আদায়, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয়— সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই রাজস্ব প্রশাসনকে রাজনৈতিক ও অন্য যেকোনো অযাচিত চাপমুক্ত রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
জাহিদ হোসেন আরও বললেন, চলতি অর্থবছরের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত গতিশীল করা এবং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের মতো স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে, কর আদায়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে— এমন শঙ্কার কথা জানালেন তিনি।






