ফখরুদ্দীন সরকারের প্রত্ন কেলেঙ্কারি: ফ্রান্সে প্রত্নসম্পদ পাঠানো ঘিরে ২০০৭ সালে যা ঘটেছিল

প্রত্ন কেলেঙ্কারি ঘিরে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার
ঘটনাটি ঘটেছিল এখন থেকে প্রায় দুই দশক আগে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই সেনা সমর্থিত ওই সরকার দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নামে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং আমলাকে গ্রেফতার করে জেলে ভরতে শুরু করে।
এর মধ্যে জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সভাপিত শেখ হাসিনা এবং সেপ্টেম্বরে বিএনপি'র তৎকালীন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের খবরে সারা দেশে রীতিমত তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিক এমন উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে আবার উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় 'সিডর'। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূল অঞ্চলের লাখ লাখ পরিবার।
একের পর এক এসব ঘটনা ঘিরে সাধারণ মানুষের নজর যখন অন্যদিকে ব্যস্ত, তখন শিল্পী ও সমালোচকদের বিরোধিতা উপেক্ষা করে 'অনেকটা চুপিসারেই' তিন ডজনেরও বেশি প্রত্ননিদর্শন ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনীতে পাঠিয়েছিল ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার।
গুরুত্বপূর্ণ ওইসব প্রত্ননিদর্শন যে প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, সেটি নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া প্রদর্শনী শেষে সেগুলো অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরবে কি-না বা ফিরলেও রেপ্লিকা বা নকল প্রত্ননিদর্শন পাঠানো হয় কি-না, সেটা নিয়েও অনেকের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছিলো।
এর মধ্যেই দ্বিতীয় চালানে আরও বেশকিছু প্রত্নসম্পদ ফ্রান্সে পাঠানোর সময় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো দু'টি বিষ্ণুমূর্তি চুরি হয়ে যায়।
এ ঘটনার পর প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হলে কয়েক মাসের মধ্যে ফ্রান্স থেকে প্রত্ননিদর্শনগুলো বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সমালোচনার মুখে একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী।
এ ঘটনার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও ফ্রান্সফেরত পুরাকীর্তিগুলো সব আসল কি-না, সেটি নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
ফলে ১৪ বছর পর বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার।
বগুড়ার মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর থেকে ফ্রান্সে পাঠানো প্রত্ননিদর্শনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ইতোমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
"এই কমিটি সরেজমিনে গিয়ে প্রত্ননিদর্শনগুলো কী অবস্থায় আছে এবং সেগুলোর সব অরিজিনাল কি-না, বা কোনো রেপ্লিকা এসেছিল কি-না, সেটি তারা তদন্ত করে দেখে প্রতিবেদন জমা দিবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আলম।
কিন্তু ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারের সময় ফ্রান্সে প্রত্ননিদর্শন পাঠানো ঘিরে ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছিল?
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্তিক স্থান মহাস্থানগড়ের খননকাজের সঙ্গে যুক্ত হন ফরাসি কয়েকজন প্রত্নতত্ত্ববিদ।মহাস্থানগড়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত পুরাকীর্তিগুলো নিয়ে তারা ফ্রান্সে একটি প্রদর্শনী করতে শুরু থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিলেন বলে জানান কর্মকর্তারা।সেই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুরাকীর্তি চেয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠায় ঢাকায় অবস্থিত ফারাসি দূতাবাস।মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্মতি দিলে দু'পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।২০০৭ সালের ৩১শে জুলাই স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে তৎকালীন সচিব এবিএম আবদুল হক চৌধুরী এবং গিমে জাদুঘরের পক্ষে তখন ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাক আংগ্রি কস্টিলেস সই করেন বলে তখনকার পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।ওই চুক্তি অনুযায়ী ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, বগুড়ার মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, নওগাঁর পাহাড়পুর জাদুঘর এবং কুমিল্লার ময়নামতি জাদুঘর থেকে প্রায় ১৮৭টি প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।সেগুলোর মধ্যে প্রাচীন মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনকালের বিভিন্ন আকৃতির মূর্তি, শিলালিপি, মুদ্রা, পোড়ামাটি এবং তামার ফলক ছিল বলে সেসময়ের গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।গুরুত্বপূর্ণ এসব পুরার্কীতি প্রদর্শনীর জন্য বিদেশে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন তখনকার শিল্পী, শিল্প সমালোচক, সংস্কৃতিকর্মীসহ অনেকে।ফ্রান্সের সঙ্গে করা চুক্তির স্বচ্ছতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদনও করেন তারা।সেইসঙ্গে, প্রত্নসম্পদগুলো পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঢাকা ও রাজশাহীতে একাধিক মামলাও করা হয়।রিট আবেদনের শুনানিতে জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাঠানোর ঝুঁকি তুলে ধরা হলে প্রত্ননিদর্শনগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর সিদ্ধান্তের ওপর দু'মাসের স্থগিতাদেশ দেয় হাই কোর্ট।সেইসঙ্গে, ফ্রান্সে পুরাকীর্তি পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর কেন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করে আদালত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব এবং ঢাকাস্থ ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে অবিলম্বে এর জবাব দিতে বলা হয়।ঢাকায় যখন এসব ঘটনা ঘটছে, তখন বাংলাদেশের পুরাকীর্তিগুলো দেখানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল গিমে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।কিন্তু সেগুলো পাঠানোর বিষয়ে হাই কোর্ট স্থগিতাদেশ দেওয়ায় প্রদর্শনীটি শেষ পর্যন্ত না হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জ্যাক আংগ্রি কস্টিলেস।














