তুরস্ক কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- পিএমও
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশে সঙ্গে প্রতিরক্ষাশিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর যে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। আজ শনিবার দুপুরে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠকের পর প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক।
সামরিক বা প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিশেষ করে ড্রোন ও ট্যাংকসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সুযোগ আছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগেই তুরস্কের একটি ড্রোন নির্মাতা কোম্পানির কাছ থেকে ড্রোন সংগ্রহের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে রেখেছে। আজ তিন দিনের সফরের শেষ দিন ছিল তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। তার এই সফরের সামরিক কিংবা প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হলেও স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি। একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ে।
তবে দুদেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুদেশের মধ্যকার বাণিজ্য দুই শত কোটি ডলারের উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিরক্ষাশিল্পে সহযোগিতার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন।
১৯৯৯ সালেও তুরস্ক ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। আর সেই দেশটিই ২০১৮ সালে এসে বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। দেশটি এখন শীর্ষ দশ রপ্তানিকারক দেশের একটি হতে চাইছে।
আলোচনায় কী এসেছে
ঢাকায় দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে সামরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। তবে তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
তবে শনিবার দুপুরের বৈঠকে দুদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া দুদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘টু প্লাস টু’ (২+২) পরামর্শ বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের সহযোগিতার বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। তার আলোকেই ২০২২ সালে ড্রোন সংগ্রহ নিয়ে তুরস্কের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী। এবারেও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুদ্ধে তুরস্কের নির্মিত ড্রোন ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটির অগ্রগতি বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে বাজার বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ করে দিয়েছে।
সেই আলোকেই রকেট সিস্টেম ও ড্রোনসহ নানা ধরনের ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে তুরস্কের সঙ্গে পর্দার অন্তরালে আলোচনার আভাস দিচ্ছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো।
‘চীনা অস্ত্র বাজার থেকে নির্ভরতা কমানোর চিন্তা হলেও মার্কিন ও ইউরোপের অস্ত্রের দাম বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগটি ইতিবাচক,’ বলছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।
সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলছেন, ‘তুরস্কের ড্রোন ও ট্যাংকের সক্ষমতা এখন প্রমাণিত। একই সঙ্গে খরচ কম কিন্তু সক্ষমতা বেশি এমন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্ক ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে।’
‘পাকিস্তান ও চীন পাকিস্তানে যুদ্ধবিমান তৈরি করে বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করছে। তুরস্কও তেমনি বাংলাদেশে যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে এগিয়ে আসতে পারে। আমার ধারণা দুদেশের সরকার সেই আলোচনাকেই এগিয়ে নিচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের তরফ থেকে না বলা পর্যন্ত এ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন,’ বলছিলেন এমদাদুল ইসলাম।
এর আগে বাংলাদেশ তুরস্ক থেকে মাইন সুরক্ষিত সামরিক যান ও বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই তুরস্ক থেকে গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, সাঁজোয়া যান, পোর্টেবল জ্যামার, মিসাইল লঞ্চিং সিস্টেম, স্কাইগার্ড রাডার সিস্টেমসহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র কেনা হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এখন বাংলাদেশ চাইছে তুরস্ক ড্রোনসহ কিছু সামরিক সরঞ্জাম বাংলাদেশেই তৈরি করুক। দুদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেও এ নিয়ে খুব একটা আপত্তি নেই।
‘সামরিক কেনাকাটার উৎস বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য ভালো বিকল্প। দেশটি রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বরাবরই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এখন গাজীপুরে সমরাস্ত্র কারখানার আধুনিকায়নসহ বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নে দুদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্ব মন্দ হবে না,’ বলছিলেন হুমায়ুন কবির।
জানা গেছে, তুরস্ক চাইছে বাংলাদেশে সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য সেদেশে প্রশিক্ষণ সুযোগ বাড়াতে যা বাংলাদেশকে যুদ্ধে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার ও যুদ্ধ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেবে বলে দেশটি মনে করে।
তবে বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তি হস্তান্তরে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব মনে করে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তুরস্কের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রশিক্ষণ বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলছেন, ‘সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতময় বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য সামরিক দক্ষতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে তুরস্কের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সহায়তা বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হবে’।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলছেন, ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটি নিশ্চিত যে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতেই হবে। আমার ধারণা এই আলোকেই তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আর গভীর করতে সরকার সক্রিয় হয়েছে।
শুধুই কি সামরিক সক্ষমতা?
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক কাশ্মীর ইস্যুতে এবং বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে অনেক বছর ধরেই। বাংলাদেশেও দেশটি তাদের যোগাযোগ বাড়িয়েছে প্রায় ১ দশক ধরে। এর আগে ২০২০ সালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসেছিলেন।
এবার সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই তুরস্ক যোগাযোগ আরও জোরদার করেছে বলে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষক এমদাদুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, তুরস্ক অনেক দিন ধরেই বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশগুলোর একটি বলয় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এবং দেশটির সেই সক্ষমতাও আছে।
‘কাশ্মীর ইস্যুতে তারা পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদারের যে কথা বলছে দেশটি সেটি তাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হলেও অবাক হব না,’ বলছিলেন তিনি।
এর আগে ২০২০ সালে দেশটির তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলিত শাভিসলু বলেছিলেন, তাদের অস্ত্র আমদানিকারকদের তালিকায় বাংলাদেশকেও পেতে চাইছেন।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন জার্নাল কিংবা তুরস্কের প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো দেশটি শটগান, রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, লাইট মেশিন গান, হেভি মেশিন গান, ল্যান্ডমাইন, হ্যান্ড গ্রেনেড, রকেট, সেল্ফ প্রপেল্ড গ্রেনেড, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানসহ নানা ধরণের অস্ত্র ও সেন্সর তৈরি করে।
তবে যেটি নিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, সেটি হলো তুরস্কের বানানো ড্রোন। দেশটির কয়েকটি কোম্পানি ড্রোন উৎপাদন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে মেশিন গান এবং গ্রেনেড বহনকারী ড্রোনও রয়েছে। বৈশ্বিক নানা সংঘাতের মধ্যে দেশটি এখন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে, যার লক্ষ্য বৈশ্বিক ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়া।









