কমিটির প্রথম সভা
সব অংশীজনের মতামতেই সংবিধান সংশোধন
- জুলাই সনদকে ধারণ করে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা
- সাংবিধানিক আদালতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ অক্ষুণ্ন রেখেই প্রতিবেদন
- প্রতিবেদন জমা দেওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষা

ছবি: আগামীর সময়
জুলাই জাতীয় সনদকে ধারণ করে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা এবং সব অংশীজনসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত নিয়ে সর্বজনীন মতামতের আলোকেই সংশোধনী সুপারিশ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।
সাংবিধানিক আদালতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মূল কাঠামোর নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এই সংশোধনী আনা হবে। দিনক্ষণ ঠিক না হলেও শিগগিরই মতামত নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করবে কমিটি।
আজ মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। তবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সবাইকে আলোচনায় ডাকা হবে, নাকি এদের বাইরে থেকেও কোনো দলকে ডাকা হবে, সে বিষয়ে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১৭ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করেছিল জাতীয় সংসদ। তখন বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে এখন পর্যন্ত বিরোধী দল কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই এটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের ধারণাগত মতপার্থক্য রয়েছে। তারা সংবিধান সংস্কার চান।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ-সংবলিত প্রতিবেদন সংসদে জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিরোধী দল কমিটিতে তাদের প্রতিনিধির নাম দিতে পারবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কমিটি।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মত আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এই সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি কেবল সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামতকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কমিটি খুব দ্রুতই জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, আহত ও সংগ্রামী জুলাইযোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতারা, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভার আয়োজন করবে। একই সঙ্গে যারা জুলাই সনদ প্রণয়নে দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের সঙ্গেও আইনগত বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনা করা হবে, যাতে সনদের প্রতিটি ধারাকে সাংবিধানিক আইনের যথাযথ পরিভাষায় রূপান্তর করা সম্ভব হয়।
কমিটির অবকাঠামো ও গঠনপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৭ সদস্যের এই কমিটিতে বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর এবং আন্দালিব রহমান পার্থের মতো সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। তবে বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি সদস্য পদের নাম তারা সংসদের বাজেট অধিবেশনের সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যুক্ত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং এই কমিটির পক্ষ থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, বিরোধী দল যখনই তাদের তালিকা দেবে, তখনই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিরোধী দল সরাসরি বৈঠকে না থাকলেও জুলাই সনদের মধ্যেই তাদের অধিকাংশ মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে একে ‘হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন’ বা অনুচ্ছেদগুলোর সুষম সমন্বয় বলা হয়।
ভারতের ‘কেশবানন্দ ভারতী’ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, সাংবিধানিক আদালতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মূল কাঠামোর নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এই সংশোধন আনা হবে। কোনো ধরনের আবেগ বা রাজনৈতিক আদর্শ চাপিয়ে দিয়ে মূল সংস্কার থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি তার বক্তব্যে এই উদ্যোগের সময়োপযোগী গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সংবিধান কেবল কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সরকারের জন্য নয়; এটি আগামী প্রজন্মের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে কাজ করবে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকের কার্যক্রম শুরু করেন। কিছুক্ষণ বৈঠকে থাকার পর তিনি বেরিয়ে যান। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, জনপ্রত্যাশা পূরণ এবং রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। তাই কমিটি শুধু নিজেদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করবে না, সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা সংশোধনী প্রস্তাবও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবে।
সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে এলে তা নিয়ে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে জনপ্রত্যাশা পূরণে সক্ষম সংশোধনী গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বাংলাদেশের নবযাত্রা এবং রাষ্ট্রকাঠামোর বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ার যেসব বিষয় সরকারের প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কমিটির কাজকে কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিটির সামনে চ্যালেঞ্জ নয়, প্রত্যাশা রয়েছে। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আকাঙ্ক্ষাও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় রাখা হবে।
বৈঠক নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিটি সংবিধান সংশোধনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, যাতে সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষ মনে করেন, তিনি সংবিধান সংশোধনের একজন অংশীজন। সংবিধান সংশোধন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
বৈঠকে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপ ছাড়াও কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ সাকি, আন্দালিব রহমান পার্থ, নুরুল হক নুর, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। তবে কমিটির সদস্য অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না।




