ট্রেন চালাতে চায় দিল্লি, চিঠির জবাব চায় ঢাকা

বাংলাদেশ-ভারত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বন্ধ হওয়া মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস এখনো লাইনে ফেরেনি। এর মধ্যে ট্রেন চালানোর কথা জানিয়ে বাংলাদেশ থেকে তিনটি চিঠি গেছে ভারতে। কিন্তু পাল্টা জবাব আসেনি। এখন পর্যটকদের জন্য ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র খুলে দেওয়ার পর ট্রেন চালুর বিষয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে দেশটি। ভারতীয় সূত্র বলছে, দিল্লি ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে এবং বাংলাদেশের পাঠানো চিঠির জবাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শুধু মৌখিক আগ্রহের ভিত্তিতে নয়, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ফলে এখন বল ভারতের কোর্টে। দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ আবার চালুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা নির্ভর করছে চিঠির আনুষ্ঠানিক জবাব, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে সমঝোতার ওপর। পরিস্থিতি এমন, এখন ট্রেন চালাতে চাইছে দিল্লি। আর ঢাকা চায় আগের তিন চিঠির জবাব। তা না হলে ট্রেন চালানোর প্রস্তুতি নেবে না বাংলাদেশ রেলওয়ে।
ভারতীয় রেলওয়েতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আন্তঃদেশীয় ট্রেন পরিষেবা আবার চালুর কাজ চলছে বলে জানা গেছে। ঢাকার আগের আবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে ভাবছে ভারতের রেল ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সূত্র।
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে তখন সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। একই সময়ে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস, খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস এবং নিউ জলপাইগুড়ি-ঢাকা মিতালী এক্সপ্রেস রেল পরিষেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তা আর স্বাভাবিক হয়নি। বাংলাদেশের তিনটি চিঠির জবাব ভারত না দিলেও ‘নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কারণে ট্রেনগুলো চালাতে ভারত সরকার রাজি হয়নি বলে জানা গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে।
এসব নিয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মেলেনি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আপাতত কোনো কিছু খোলাসা না করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে। তবে আমাদের ট্রেন চালানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
দুই দেশের ট্রাফিক বিভাগের যোগাযোগের মাধ্যমেই ট্রেন চলাচল পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের ইন্টারচেঞ্জ শাখার উপপরিচালক মো. খায়রুল কবির বলছিলেন, ‘শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কিছুই বলতে পারব না। ভারত চিঠির জবাব দেবে কি না, এটি তাদের বিষয়। আমাদের যা জানানোর, তা বলা আছে। এখন তারা জানাবে।’
ভারত ট্রেন চালাতে চায় এমন কথা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ফোনে জানিয়েছে— এর সত্যতা কতটুকু? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এখানে শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয় নয়; পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস অনেক কিছু জড়িত। মৌখিক কথায় কি কোনো কাজ হবে। ইন্টারন্যাশনাল একটা ট্রেন কি মুখের কথায় চলবে! তারা চিঠির জবাব দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রক্রিয়া করে আগানো হবে।’
তবে ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছে, ট্রেন চালুর বিষয়ে বাংলাদেশের চিঠির জবাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুতই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের জবাব পাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সূত্র বলছে, সম্প্রতি ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে দেশটির রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। সেই আবেদনে আগের মতো সপ্তাহে পাঁচ দিন মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রেল মন্ত্রণালয়ের ট্রাফিক ট্রান্সপোর্ট বিভাগের পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবুজসংকেত মিললেই পরিষেবা শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ভারতের রেল বিশেষজ্ঞ তপন কুণ্ডুর মতে, ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেন নয়, এটি ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও পারিবারিক সম্পর্কের অন্যতম সেতুবন্ধ। তাই পরিষেবা আবার চালু হলে দুই দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হবে, তেমনই পর্যটন ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমন্বয় নিশ্চিত করেই পরিষেবা শুরু করা উচিত।’
এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় রেল যোগাযোগব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে গত মার্চে ৩৮তম ‘ইন্টার-গভর্নমেন্ট রেলওয়ে মিটিং’ (আইজিআরএম) হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সম্ভাবনা ছিল গত মাসে হওয়ার; সেটিও হয়নি। তবে আইজিআরএমের প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে দুবার। সম্প্রতি ভারত থেকে বাংলাদেশকে আইজিআরএম সভার সময় প্রস্তাব করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ে বাংলাদেশ বৈঠক করতে রাজি হচ্ছে না। নতুন সময় জানিয়ে ঢাকা থেকে দিল্লিতে পাল্টা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের উপপরিচালক (ইন্টারচেঞ্জ) মো. খায়রুল কবির বললেন, ‘এগুলো আপনার জানার কথা নয়। এসব রেলের ইন্টারনাল বিষয়।’
যদিও এই বৈঠকের ওপর ট্রেন চলাচলের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। গত বছর ৬ অক্টোবর আন্তঃসরকার বৈঠকের আলোচ্য সূচি নিয়ে যে প্রস্তুতিমূলক সভা হয় তাতে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চালানোর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস আবার চালুর বিষয়ে আগের চিঠির ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবারও চিঠি দেওয়ার কথা হয় এবং সেই চিঠি পাঠানোও হয়েছিল।
ট্রেন চালাতে কূটনৈতিক আলোচনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তার মতে, আন্তঃদেশীয় ট্রেন দুই দেশের বন্ধনেরও প্রতীক। ট্রেন চালু করতে যেসব জায়গায় প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা দরকার।







