পাঁচ বছরে আত্মহত্যা ১৮৫৯ শিক্ষার্থীর
- স্কুলশিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে পরে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ
- শীর্ষে ঢাকা বিভাগ, এরপর চট্টগ্রাম ও রাজশাহী
- ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ব জুড়ে অন্যতম জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে আত্মহত্যা। সব বয়সী মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়লেও বাংলাদেশে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ১ হাজার ৮৫৯ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। যার বেশিরভাগই স্কুল পর্যায়ের।
কেন বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা, তা খুঁজতে গেলে উঠে আসে হতাশা, মান-অভিমান, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার মতো সমস্যাগুলো। যেমন চাকরি না পাওয়ার হতাশা আর মানসিক চাপ থেকে ২০২১ সালে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহাদী। ভালো ফলাফল ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য থাকার পরেও চাকরি না পাওয়ার চাপ থেকে পরীক্ষার আগের রাতে নিজের ঘরে আত্মহত্যা করেন তিনি। যা তুলে আসে দেশের হাজারও তরুণের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের চিত্র।
সদ্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করা জিয়ানও বললেন, এই চাপের কথা। চাকরি না পাওয়া, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় প্রতিদিন তার চাপ বাড়ছে। তিনি বলছিলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় সব শেষ করে দিই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না।’
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। সামগ্রিকভাবে মোট আত্মহত্যার প্রায় ৫০ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় ২৫ শতাংশ, কলেজে ১৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ১০ শতাংশ। বিশেষ করে কৈশোরকালের আবেগ, পারিবারিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতা এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৫ সালে আত্মহত্যা করা ৪০৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯০ জন ছিলেন স্কুল পর্যায়ের, যা প্রায় ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩১০ জনের মধ্যে ১৮৯ জন, ২০২৩ সালে ৫১৩ জনের মধ্যে ২২৭ জন, ২০২২ সালে মোট ৫৩২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪৬ জন ছিলেন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ের। এ ছাড়া ২০২১ সাল ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। ওই বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে ৬২ জনই ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীরা রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ২০২৩ সালে এই বয়সের ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় সব বছরই নারী শিক্ষার্থীরা ছিলেন আত্মহননের শীর্ষে। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে। তবে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। যা মহামারীকালে আর্থিক ও ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তার চাপকে নির্দেশ করে।
আঞ্চলিকভাবে আত্মহত্যার শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। এরপরের অবস্থান চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর। এই প্রবণতার কারণ হিসেবে আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, সবচেয়ে বড় ভূমিকা মান-অভিমানের। ২০২৩ সালে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু অভিমান থেকে আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া প্রেমঘটিত সম্পর্কের জটিলতা ও বিচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক চাপ এবং ছোটখাটো মানসিক আঘাতও আত্মহত্যার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এমনকি মোবাইল ফোন না পাওয়া, গেম খেলতে বাধা দেওয়া বা সামান্য পারিবারিক বকাঝকাও অনেক ক্ষেত্রে বড় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে কথা হয় সাজিদা ফাউন্ডেশনের মানসিক বিভাগের প্রধান ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রুমা খন্দকারের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে ডিপ্রেশন, এনজাইটি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা, ডিজিটাল নির্ভরতা ও একক পরিবার ব্যবস্থার কারণে শিশু-কিশোররা প্রয়োজনীয় মানবিক ও আবেগীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা এবং ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার অক্ষমতা তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছে, উল্লেখ করেন তিনি। বলছিলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের কুসংস্কার ও স্টিগমার কারণে অনেকেই সমস্যার কথা প্রকাশ করতে পারে না।’ তাই এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামাল চৌধুরী বললেন, ‘আমরা অন্যান্য রোগ নিয়ে যতটা আতঙ্কিত, আত্মহত্যা নিয়ে ততটা নই। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি এই অবহেলাই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ করছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শাহরিনা ফেরদৌস জোর দিলেন মোবাইল ফোনের আসক্তি কমানো এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করার ওপর।’
আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজ আগামীর সময়কে বললেন, স্কুল-কলেজে আত্মহত্যা রোধে নাগরিক সমাজ, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তা না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সহজ হবে না।






