টিকটকে কথিত তান্ত্রিকের ফাঁদে নারী খোয়ালেন সাড়ে ৬ লাখ টাকা
- অলৌকিক ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিতেন টাকা
- কখনও পরিচয় দিতেন পাগলা মসজিদের খাদেম
- কবিরাজির ভিডিও দিয়ে পাতা হতো প্রতারণার জাল

সংগৃহীত ছবি
মানুষের অসহায়ত্বই ছিল তার পুঁজি, আর অলৌকিক ক্ষমতার গল্প ছিল প্রতারণার অস্ত্র। টিকটকে কখনো তান্ত্রিক, কখনো কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের খাদেম সেজে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেন তিনি। হাড়, মাছ ও পাখি দিয়ে কবিরাজির ভিডিও বানিয়ে জাগাতেন অলৌকিক শক্তির বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে পাতেন প্রতারণার ফাঁদ। এরপর পারিবারিক সমস্যা দূর করার আশ্বাসে দুই শতাধিক লোকের সঙ্গে করেছেন প্রতারণা। হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। এরমধ্যে এক নারীর কাছ থেকেই হাতিয়েছেন সাড়ে ছয় লাখ টাকা। কিন্তু সেই টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে ওই নারীকে শুনতে হয়েছে অলৌকিক শক্তির ভয়ভীতির। তবে শেষ পর্যন্ত রেহাই পাননি সেই কথিত তান্ত্রিক।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুর থেকে মো. মিজানুর রহমান (২৫) নামের তান্ত্রিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, এ প্রতারণার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত। এ চক্রের জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী নুসরাত মরিয়ম (ছদ্মনাম) টিকটকে ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের ভিডিও দেখে এর পরিচালনাকারীর সঙ্গে পরিচিত হন। পারিবারিক সমস্যার সমাধানের আশায় পরে ইমু ও মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখনই শুরু হয় প্রতারণার ফাঁদ। অভিযোগ অনুযায়ী, কথিত তান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কবিরাজির বিভিন্ন উপকরণ কেনার কথা বলেন। এভাবে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিকাশের মাধ্যমে ওই নারীর কাছ থেকে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সমস্যার সমাধান না পেয়ে টাকা ফেরত চান ভুক্তভোগী। অভিযোগ, তখন তাকে বিভিন্ন অলৌকিক শক্তির ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আইনের আশ্রয় নেন তিনি।
আজ সোমবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান বলেন, চলতি বছরের ৪ জুলাই ভুক্তভোগী নারী উত্তরা পশ্চিম থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। তিন মাস পরে গত ১০ অক্টোবর পিবিআই উত্তর স্ব-উদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন এসআই মো. নাজমুল হক। এরপর তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ অক্টোবর ভোরে জামালপুরের চর যথার্থপুর ভাটিপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তাকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং অন্যান্য সহযোগীদের নাম উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কারকে পুঁজি করে প্রতারণাকারী সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণা করে আসছে। সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করব, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ বা অলৌকিক সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন থাকুন। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির হোসেন জানিয়েছেন, প্রতারক চক্রটি মানুষের আবেগকে পুঁজি করে দীর্ঘ দিন ধরে এভাবে প্রতারণা করে আসছে। কথিত তান্ত্রিক অন্তত হাজার খানেক লোকের সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। এরমধ্যে অন্তত দুই শতাধিক লোক তার কথায় বিশ্বাস করে টাকা পয়সা দিয়েছেন। অনেকে এক দুইবার টাকা দিয়ে বুঝতে পেরে আর যোগাযোগ করেনি। টাকার অঙ্ক ছোট থাকায় অনেকে প্রতারণা শিকার হয়েও অভিযোগ করেননি। কিন্তু ভুক্তভোগী ওই নারীর কাছে থেকে সব চেয়ে বেশি টাকায় আদায় করায় তিনি প্রতারণা বুঝতে পেরে আইনের সহায়তা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, মামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।



