হাত বাঁধবেন না, আমাদের কাছে আবার আসতে হবে: মতিউর রহমান
- প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে টিআইবির গোলটেবিলে মতিউর রহমান চৌধুরী
- সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা করার দাবি

ক্ষমতায় থাকতে সরকার সমালোচনা ঠেকাতে কঠোর আইন করতে চায়, অথচ ক্ষমতা হারানোর পর সেই আইনই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়— এমন মন্তব্য করেছেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের হাত আবার বাঁধবেন না, আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’
গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে এসব মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি বললেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’
মতিউর রহমান চৌধুরীর ভাষ্য, ‘পৃথিবীতে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এ কারণে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রণয়ন করা উচিত। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজন আছে। তবে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা করতে হবে।’
‘সরকারের সমালোচনা হবেই, গণতান্ত্রিক সমাজে তা হতেই পারে। এই দুটিকে আলাদা করা না গেলে বিপদ থেকে যাবে’— যোগ করলেন তিনি।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নোয়াব সভাপতি। আইনের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি। স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন দলের নেতার ফোনেই কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’ প্রস্তাবিত আইনে ‘ভুল তথ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তার আশঙ্কা, ‘কোনো সংবাদ কারও পছন্দ না হলেই সেটিকে ভুল তথ্য বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত সংবাদ বলে দাবি করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনটি ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য, তা কে নির্ধারণ করবেন, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন।’
সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টির বিরোধিতা করেন নোয়াব সভাপতি। তিনি বলছিলেন, ‘ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়— সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?’
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে জেলায় জেলায় আলোচনা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তার দাবি, আইন প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন এই বৈঠকের আয়োজন করে। এটি পরিচালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
মতিউর রহমান চৌধুরী ছাড়াও গোলটেবিলে অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের সমালোচনা করেন। তারা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপতথ্য মোকাবিলায় প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কঠোর আইন চাপিয়ে দিলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই বুমেরাং হতে পারে।
স্বাগত বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘আইনে প্রাধান্য পেয়েছে কীভাবে ক্ষমতাকে আরও কুক্ষিগত করা যায়। যার মাধ্যমে বাকস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়। প্রস্তাবিত আইনটি সরকারের জন্য বুমেরাং হবে। আত্মঘাতী হবে। সরকারের উচিত এই অবস্থান থেকে সরে আসা।’
আইন করে ভুয়া তথ্য, অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, ‘সত্যিকার অর্থেই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।’
ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকমাধ্যমগুলো বিপুল মুনাফা করছে উল্লেখ করে তিনি বললেন, প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে আইন করে ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কার্যকর হবে না। ভুয়া তথ্য ঠেকানোর নামে মানুষের অধিকারকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করা যৌক্তিক নয়।
‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম একই পথের যাত্রী। তাই তাদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি’— যোগ করলেন তিনি। তার দাবি, প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধন প্রয়োজন।
গোলটেবিলে অংশ নেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ প্রমুখ।



