এসি বাস ও ট্রাকের ভাড়া বাড়ায় কে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডিজেলের দাম বাড়ার পর বেড়েছে গণপরিবহনের ভাড়া। গত বৃহস্পতিবার সরকার জারি করেছে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন। শনিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটের গণপরিবহনসহ তালিকা প্রকাশ করেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী রুটের পুনর্নির্ধারিত ভাড়ার। রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন ভাড়া। অবশ্য বাসের ক্ষেত্রে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় (নন-এসি) এমন বাসের ভাড়া বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এসি বাসের ভাড়া বাড়বে না? কিংবা বাড়লে সেটা আসলে কারা বাড়ান?
এসি বাসের মতো পণ্যবাহী যানের ভাড়াও নির্ধারণ করে না বিআরটিএ। ফলে দুই ক্ষেত্রেই মালিক সমিতি তাদের মর্জি-মাফিক নির্ধারণ করে ভাড়া। অবশ্য এর পেছনে মূলত কাজ করে দুটি কারণ। প্রথমত, এসি বাস ও পণ্যবাহী যানের ধরন, গড়ন, বৈশিষ্ট্য এবং ধারণক্ষমতা একটি থেকে অন্যটি ভিন্ন হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়ত, বাহনগুলোর সেবার মানেও রয়েছে ভিন্নতা। ফলে ওই সব বাহনে ‘চাহিদা-জোগান’ সমীকরণে ওঠানামা করে ভাড়া।
কোন মানের এসি বাসের ভাড়া কত হবে— সেটি ঠিক করে বাসের মালিকপক্ষ। কোনো কোনো সময় পরিবহন মালিক সমিতি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যে কারণে দেশের ইতিহাসে কখনোই এসি বাস ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে পারেনি সরকার।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ৮০ লাখ থেকে শুরু করে আড়াই কোটি টাকার এসি বাস সড়কে চলছে। একেক বাসের সেবার মানও একেক রকম। ফলে সব বাসের ভাড়া সমান হতে পারে না। একই দূরত্বের জন্য পার্থক্য রয়েছে একেক কোম্পানির বাসের ভাড়ায়। বিস্ময়করভাবে এটি মেনে নিয়েছেন যাত্রীরাও।
এসব নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ভাড়া কত হবে, সেটি নির্ধারণ করেন মালিকরা। তবে সেটি সাধারণত অবাস্তব রকমের কিছু হয় না।
জোবায়ের মাসুদের দাবি, নির্ধারিত ভাড়া ঠিক আছে কি না, তা বিচার করেন যাত্রীরা। সেবার মান ভালো হলে যাত্রীরা আপত্তি করেন না। কিন্তু সেবার মান নিশ্চিত করা না গেলে যাত্রীরা একবার এসে আর আসেন না, যার চাপ গিয়ে পড়ে ব্যবসায়। ফলে মালিকপক্ষও অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ায় না।
কেন এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না? এমন প্রশ্নের জবাবে জোবায়ের মাসুদের ভাষ্য, ‘সরকার এটির উদ্যোগ নিতে চায় না। আমরা কিলোমিটারপ্রতি পাঁচ টাকার একটি প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি। কিন্তু এখনই সরকার কোনো ভাড়া নির্ধারণ করবে বলে মনে হয় না।’
একইভাবে পণ্য পরিবহনের জন্য যেসব যান ব্যবহার হয়, সেগুলোর ভাড়াও সরকার নির্ধারণ করে না। এমনকি আজ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যানের মতো পণ্যবাহী যানের কিলোমিটারপ্রতি কোনো ভাড়া।
সাধারণত পণ্যবাহী যানের বড় অংশ চলে শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে। ঢাকা, গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোতেই পণ্যবাহী যানের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকার বেশিরভাগ গাড়ি চলে ‘সিন্ডিকেটের’ অধীনে। এরাই আনুষ্ঠানিকভাবে ভাড়া নির্ধারণ করে। যেমন এই মুহূর্তে— গার্মেন্টসের জন্য ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে চট্টগ্রামের নির্ধারিত ট্রাক ভাড়া ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। আর ফিরতি চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া দিতে হচ্ছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। বাজারে তেলের দাম ও গাড়ির ভাড়া কমবেশি যা-ই থাকুক না কেন, বছরব্যাপী ব্যবসায়ীদের দিতে হচ্ছে ওই ভাড়া।
গার্মেন্টসের বাইরে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে ট্রাক ভাড়া গত সপ্তাহে ছিল ১৪ হাজার টাকা। চলতি সপ্তাহ থেকে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এমনটি কেন হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে পণ্যবাহী পরিবহন নিয়ন্ত্রক সমিতি বাংলাদেশ ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদারের যুক্তি, ‘এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ চাহিদার সঙ্গে জোগানের মিল না থাকা। যখন চাহিদার তুলনায় গাড়ি বেশি থাকে, তখন ভাড়া কমে যায়। আর উল্টো হলে বেড়ে যায় ভাড়া।’
কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া কেন নির্ধারণ করা যাচ্ছে না— এমন প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার। তার দাবি, ‘আমাদের ইচ্ছা আছে। আগের সরকারকে আমরা একটা প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। ভাড়া নির্ধারিত থাকলে শৃঙ্খলা থাকবে। দুইটা হিসাব সরকারের কাছে জমা দেওয়া আছে। একটিতে প্রতি কিলোমিটারে ২৬৯ টাকা এবং অন্যটিতে ৯৭ টাকা ৬২ পয়সা ভাড়া চাওয়া হয়েছে।’



