ড. ইউনূসকে হেনস্তা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে

সংগৃহীত ছবি
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করলে তা কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না। এদিকে ঘটনার পর ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এটাই ফ্যাসিবাদীদের চরিত্র। তাদের কাছ থেকে সভ্য কিছু আশা করা যায় না। আমি আমার কাজ চালিয়ে যাব। আমি ভালো আছি।’
ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস সেক্রেটারি গোলাম মোর্তোজা আগামীর সময়কে বলেন, সাবেক এই প্রধান উপদেষ্টা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।
জেএফকে বিমানবন্দরে হেনস্তার ঘটনাটি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানিয়েছে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনার কঠোর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্থগিত থাকা (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহভাজন একদল অপরাধী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানির পেছনে রয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে, যাতে দায়ীদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোর্তোজা আগামীর সময়কে বলেন, ‘ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে কাজ চলছে।’
গত সোমবার জেএফকে বিমানবন্দরে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ড. ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজান চৌধুরী, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, জ্যাকসন হাইটস আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর কায়সার ও ইমদাদ চৌধুরীর নাম জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা আরও কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে আগে থেকেই বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন।
এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বলতে চাই, তারা যদি এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন, তা আনচ্যালেঞ্জড যাবে না, প্রশ্নই আসে না।’
ড. ইউনূসের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা-ও সরকার খতিয়ে দেখবে বলে জানান উপদেষ্টা। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় সরকার যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছিল, এবারও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত মাসে ইতালিতে বাঁধন হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন। ওই ঘটনায়ও আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা। মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা এ ঘটনার কঠোর নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টারা বলেন, ‘বছরের পর বছর লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে পড়া ও দুর্নীতি, পদ্ধতিগত দমন-পীড়ন এবং ব্যাপক পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আমাদের দেশ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, সেই সময় দেশ পুনর্গঠনের অত্যন্ত কঠিন কাজ সামলাতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এই অন্তর্বর্তী সরকারই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটিয়েছিল, যেগুলো ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিয়মিত ঘটানো হতো।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংস্কার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক জনসমর্থন অর্জিত হয়েছে, তা ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার ও অপচেষ্টায় মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।’
বিবৃতিদাতারা হলেন সাবেক উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সিআর আবরার, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, শারমিন এস মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘পরাজিত ও পলাতক শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে অনুসারীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছেন। তার লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসীরা ড. ইউনূসের সঙ্গে অপকর্ম করেছে। এর দায় ফ্যাসিস্ট হাসিনারই।’ মঙ্গলবার নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
এ ঘটনায় সরকারকে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর ভাষ্য, দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এ হামলা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির নির্মম, সহিংস ও অমানবিক চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসীদের এমন অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের উদ্যোগ শুরুর দাবিও জানান তিনি।
তবে বিমানবন্দরের এ ঘটনা ড. ইউনূসের ওপর কোনো ‘প্রভাব ফেলেনি’ বলে জানিয়েছেন তাঁর সফরসঙ্গী লামিয়া মোরশেদ। মঙ্গলবার বিকেলে ফেসবুকে দুই শিশুর সঙ্গে নোবেলজয়ী ইউনূসের একটি ছবি পোস্ট করে এ কথা জানান তিনি। লামিয়া মোরশেদ ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক। তিনি সাবেক প্রধান উপদেষ্টার টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কও ছিলেন।
ওই পোস্টের ক্যাপশনে লামিয়া মোরশেদ লেখেন, ‘জেএফকে বিমানবন্দরে ওই বর্বর লোকগুলো তাকে (ড. ইউনূস) হেনস্তা করার কয়েক মিনিট আগে ছবিগুলো তুলেছিলাম।’
তিনি আরও লেখেন, ‘পুরো যাত্রাপথে তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অটুট ছিল। তিনি ভালো আছেন। এ ঘটনা শুধু ওই লোকগুলোর চরম অসভ্যতা আর তাদের নিচু মানসিকতাই প্রকাশ করেছে। স্যারের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।’




