মন্ত্রিসভায় রদবদলে অনেক কৌতূহল, অনেক আলোচনা
- লক্ষ্য কাজে আরও গতি আনা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা
- তবে কয়েকটি পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বদলেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কেউ পেয়েছেন পদোন্নতি। কেউ হারিয়েছেন আগের দপ্তর। কাউকে আবার মন্ত্রিসভায় রেখে দেওয়া হয়েছে নতুন দায়িত্বে। সব মিলিয়ে এই রদবদলে সরকারের পরবর্তী ছয় মাসের কাজের ধরন ও অগ্রাধিকারের একটি বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে তথ্য ও সম্প্রচার, স্থানীয় সরকার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা বেশি। কোথাও মন্ত্রীর দপ্তর বদলেছে। কোথাও প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন পূর্ণমন্ত্রী। আবার কোথাও নতুন মুখ এনে বাড়ানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব।
সরকারের ভেতরের আলোচনা ছিল, প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করেই এই পরিবর্তন আনা হতে পারে। লক্ষ্য—মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে আরও গতি আনা এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। তবে কয়েকটি পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
গত ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর গত শুক্রবার মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও রদবদল করা হয়। নতুন করে পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন। একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন পূর্ণমন্ত্রী। একই সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর দপ্তরও বদলে দেওয়া হয়েছে।
তথ্যে বড় পরিবর্তন: রদবদলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে। জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে সেখানে মন্ত্রী করা হয়েছে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে। স্বপনকে কেন সরানো হলো, তা নিয়েই বেশি আলোচনা চলছে। বিএনপির ভেতরে একটি অংশ মনে করছে, গণমাধ্যমের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক এবং সাংবাদিকবান্ধব অবস্থানের কারণে তিনি মন্ত্রণালয়ে ভালো করছিলেন। তবে এই সময়ে তার বিরুদ্ধে কেউ কেউ হাইকমান্ডের কাছে কানভারীও করেছেন।
সরকার-সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বলেছেন, তথ্যমন্ত্রী হিসেবে বিরোধী দল ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জহির উদ্দিন স্বপনের কাছ থেকে আরও আগ্রাসী রাজনৈতিক অবস্থান আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই জায়গায় তিনি তার মতো করে রাজনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। কিছু নিয়োগ নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে তার কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে কারও কারও দাবি।
তবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে না থাকলেও সরকারের বাইরে যাচ্ছেন না জহির উদ্দিন স্বপন। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার এ-সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
জানা গেছে, নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। লন্ডনে বিবিসিতে কাজ করার সময় থেকে ইয়াসেরের সঙ্গে পার্থর ঘনিষ্ঠতা। দুই পরিবারের মধ্যেও পুরনো সম্পর্ক রয়েছে। পার্থর বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জু এবং ইয়াসেরের বাবা আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
নতুন মন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ইয়াসের খান চৌধুরী বললেন, তারা টিমওয়ার্কে বিশ্বাস করেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণ করতে চান।
স্থানীয় সরকারে মঈন খান: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় শূন্য হয়। সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ড. আবদুল মঈন খানকে। দলীয় নেতাদের অনেকে এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অভিজ্ঞ মঈন খানের দায়িত্বে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাজ আরও গতিশীল হতে পারে। এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছে মীর শাহে আলম।
রিতার দপ্তর বদল, মিল্লাতের পদোন্নতি: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। ফলে এটি তার স্পষ্ট পদোন্নতি। অন্যদিকে এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি হতাশ হয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে।
রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, মন্ত্রিসভার রদবদলের মূল লক্ষ্য দেশকে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের স্বার্থে কাজ করাই তাদের লক্ষ্য। তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের কল্যাণে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নেও তারা কাজ করবেন।
পাহাড়ে সন্তুষ্টি: বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী করা হয়েছে। গত ১ জুন দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করার পর থেকে মন্ত্রণালয়টির দায়িত্বে ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তখন থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে একজন পাহাড়ি প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি ছিল। সাচিং প্রু জেরীকে মন্ত্রী করায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
পররাষ্ট্রে ২ প্রতিমন্ত্রী: প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকা প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। টেকনোক্র্যাট কোটায় এই দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। তারেক রহমানের সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিকবিষয়ক) হন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিতে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা থাকাকালে সরকারের হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও কাজ করেছেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শুরু থেকেই মন্ত্রী হিসেবে আছেন ড. খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন শামা ওবায়েদ। এর মধ্যে খলিলুর রহমান গত জুনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বাড়াতেই আরও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। তার মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে আগামী এক বছর খলিলুর রহমানকে ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে টিমওয়ার্কের প্রয়োজন হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বিতর্ক: ধর্মমন্ত্রী হিসেবে কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) দায়িত্ব পালন করছেন শুরু থেকেই। নতুন করে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে শামীম কায়সার লিংকনকে। তবে তাকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী না করার দাবি জানিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পরও পরিবর্তনের আলোচনা থামেনি।
সরকারের ভেতরে-বাইরে আরও কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার আলোচনা রয়েছে। আরও কিছু দপ্তরেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে গত কিছুদিন ধরে স্বরাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে যে রদবদলের গুঞ্জন ছিল, এবারের পরিবর্তনে তা দৃশ্যমান হয়নি।





