সেমিনারে বক্তারা
বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মানবেন্দ্র লারমার সংবিধান দর্শন অনুসরণের আহ্বান

ছবি: আগামীর সময়
বহুত্ববাদী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শনকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত অর্থে বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আজ শনিবার ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে আইপিনিউজ বিডির উপদেষ্টা সম্পাদক সতেজ চাকমা সঞ্চালনা করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ।
মূল প্রবন্ধে পাভেল পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গ্রাফিতি জনআকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে শ্রমজীবী, আদিবাসী, শিশু ও নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস মূলধারার বয়ানে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, গ্রাফিতি মুছে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক জনআকাঙ্ক্ষাকেও আড়াল করা হয়েছে। জুলাইকে শুধু সরকার বা শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, উপনিবেশিক কাঠামো ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কাপ্তাই বাঁধ, মধুপুর ও ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন গণপ্রতিরোধের ধারাবাহিকতার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোগসূত্রও তুলে ধরেন পাভেল পার্থ।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে আদিবাসী আত্মপরিচয়, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি, ভূমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি এবং সামরিকায়নের প্রশ্ন দৃশ্যমান হয়েছে। কল্পনা চাকমার নিখোঁজের ঘটনা, আদিবাসী নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিষয়ও বিভিন্ন গ্রাফিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘কল্পনা চাকমা কোথায়’, ‘জাস্টিস ফর কল্পনা চাকমা’ ও ‘ইনডিজেনাস লাইভস ম্যাটার’র মতো বার্তার মাধ্যমে অধিকার ও স্বীকৃতির দাবি সামনে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ‘পাহাড়ে কবে মুক্তি মিলবে’ বা ‘পরাধীন পাহাড়’র মতো গ্রাফিতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি জাতীয় সংসদে নারীর অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি মেহনতি মানুষের অধিকারের কথাও তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেন, আজকের জুলাই সনদে বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। বৈষম্য নিরসনে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেটিও পরিষ্কার করা হয়নি।
সারা হোসেন আরও বলেন, ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। সংবিধানে নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে, সে বিষয়ে যে ধরনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন, জুলাই সনদে তা প্রতিফলিত হয়নি।
তার ভাষায়, সত্যিকার অর্থে বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শনকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়া, কথা বলা এবং দাবি তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্র মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনকে স্বীকার করে ধারণ করে এগোতে পারলে আজকের রাষ্ট্র একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। তবে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো সন্দেহ রয়েছে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্যবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, তার পেছনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সে সময় রাষ্ট্র তার বক্তব্য ও দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর অধিকারের কথা বলেননি উল্লেখ করে বখতিয়ার আহমেদ বলেন, তিনি দেশের অধিকারহীন জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন জাতিসত্তা এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন।
তার মতে, আজকের বাংলাদেশে যে বহুত্ববাদের কথা বলা হচ্ছে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭২ সালেই সেই কথা বলেছিলেন। তাই তার চিন্তা ও দর্শনকে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রান্তসীমায় গেলে রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। জনগণকে দেখার ক্ষেত্রে শুধু গোয়েন্দা তথ্য বা গোয়েন্দা-নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর না করে জনগণের অভিজ্ঞতা, মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রকে জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ তৈরি করতে হবে।
কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, বহুত্ববাদের কথা অনেক সময় শুধু মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কেন এখনো বিমানবন্দরে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের অবিবাহিত পরিচয়ের কারণে বিদেশযাত্রায় আটকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে।
তিনি বলেন, যেসব কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেসব কমিশনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিকে প্রকৃত বহুত্ববাদ বলা যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধানে একদিকে সাম্য ও সমতার কথা বলা হলেও অন্যদিকে বৈষম্যের সুযোগ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর উদাহরণ হিসেবে সংবিধানে আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে পরিচিত করার বিষয়টি উল্লেখ করেন সোহরাব হাসান। তার মতে, একটি জাতির পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা নিজেদের এলাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে মানবতাবাদী চিন্তক উল্লেখ করে সোহরাব হাসান বলেন, তিনি সাম্য, সমতা ও মানুষের অধিকারের দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তার চিন্তা ও দর্শন বহুত্ববাদী ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
দীপায়ন খীসা বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশকে একটি বহুজাতি, বহুধর্মী ও বহুভাষী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে সেই বহুত্ববাদ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট আলোচনা প্রয়োজন।
বর্তমানে সালাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সালাউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ছিলেন। মেঘালয় বিশেষ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। ফলে সেখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আদিবাসীদের অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়গুলো তার জানার কথা। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্নটি যেন উপেক্ষিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দীপায়ন খীসা বলেন, আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্মান করা।
সাখাওয়াত টিপু বলেন, পাহাড়ের সঙ্গে তার একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ে বেড়ে ওঠা এবং পাহাড় ও সমুদ্রের পরিবেশে চট্টগ্রামে বড় হওয়ার কারণে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক অনুভব করেন।
তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শন আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠী ভালো না থাকলে সেই রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে ভালো থাকতে পারে না।
রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র তখনই বোঝা যায়, যখন সেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিরাপদে, শান্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সম্পর্কে শুনে আসছেন। তিনি গরিব, মেহনতি মানুষ, বেদে, জেলে ও নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও এসব মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে সংসদে তাঁর কণ্ঠ সোচ্চার ছিল।
তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনে নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিকসহ সমাজের সব মানুষের অধিকার ও সমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।



