মিরপুরে শায়িত হলেন গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসার

গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসার- সংগৃহীত
মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসার। সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজার পর বাদ যোহর তাকে দাফন করা হয়।
গত শনিবার রাত ৯টা ৪৫মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সোমবার বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহ রাখা হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন আয়োজনে বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, শিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের ছেলে আদনান মুকিত ও ডা. হারুন অর রশীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন এবং আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন সংগীতশিল্পী আমিরুন নূজহাত মনীষা।
পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ মার্কসবাদী, ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাম মোর্চা, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমগীত, সমাজ চিন্তা ফোরাম, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্র, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
গণসংগীত শিল্পী কামরুদ্দীন আবসার ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আব্দুল মুকিত ও মা ছিলেন উম্মল ফাতেমা। মৃতুকালে তার স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম ও একমাত্র পুত্র আদনান মুকিত এবং অসংখ্য সহকর্মী ও সমর্থক রেখে গেছেন।
২০১১ সালে স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবসার। পরে আর সুস্থ হতে পারেননি। স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি মূলত বাসাতেই থাকতেন। গত ১৪ মে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ঢাকায় একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ক্রমাগতভাবে শারীরিক অবনতি হতে থাকে এবং শনিবার পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি কামরুদ্দীন আবসারের ছিল গভীর অনুরাগ। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ মুন্সি রইসউদ্দীন এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের কাছে তিনি সংগীত শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যানিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজে অধ্যয়ন করেন।
শিল্পীজীবনের প্রারম্ভে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) সংগীত ও পরিচালনা বিভাগের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে কামরুদ্দীন আবসারের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে গণসংগীতের ভুবনে। তিনি বিশ্বাস করতেন গান মানুষের সংগ্রামের ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা, আবার একই সঙ্গে ভালোবাসা ও মানবতার ভাষাও। তার কণ্ঠে ‘চল রে ভাই, উজান বেয়ে যাই’, ‘আমি কোনো ভালোবাসার গল্প জানি না, যেটুকু জেনেছি সবটুকুই যুদ্ধের’ কিংবা ‘তোমরা যদি বলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, আমি মানবো না’ শুধু গান হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের সংগ্রামী চেতনার অংশ।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছেন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে। লেখক শিবিরের সংগীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। সত্তরের দশকের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তিনি গান গেয়ে তহবিল সংগ্রহ করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রাজপথে ছিলেন প্রতিবাদী শিল্পীদের অগ্রভাগে। তার কণ্ঠে গণসংগীত আন্দোলনরত মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
পরবর্তী সময়েও গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তার প্রকাশিত অ্যালবামের মধ্যে ‘মে দিবসের গান’ এবং ‘বাংলার কমরেড বন্ধু’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি তিনি নিজে বহু গণসংগীত রচনা ও সুরারোপ করেছেন।
গণসংগীতের বাইরে শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সুকুমার বড়ুয়াসহ বহু কবি ও ছড়াকারের শতাধিক ছড়ায় সুর দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’র সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গানের দল ‘সৃজন’। গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক জোট ‘সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উৎসবে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ তাকে সম্মাননা অর্পণ করে।





