গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসার মারা গেছেন

কামরুদ্দীন আবসার। ছবি : আগামীর সময়
গণসংগীতশিল্পী, সুরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী কামরুদ্দীন আবসার মারা গেছেন। গতকাল শনিবার রাত ৯.৪৫ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংস্কৃতিকর্মী।
এর আগে তিনি শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত ১৪ মে রাতে হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম, পুত্র আদনান মুকিত দীপ্রসহ অসংখ্য সহকর্মী, সহযোদ্ধা, শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী ছিলেন।
ছেলে আদনান মুকিত আগামীর সময়কে বলেছেন, সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কামরুদ্দীন আবসারের মরদেহ আগামীকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা হবে।
১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কামরুদ্দীন আবসার। তার মা উম্মুল ফাতিমা এবং পিতা আবদুল মুকিত। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ মুন্সি রইসউদ্দীন এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের কাছে তিনি সংগীত শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যানিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজে অধ্যয়ন করেন।
শিল্পীজীবনের প্রারম্ভে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) সংগীত ও পরিচালনা বিভাগের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে কামরুদ্দীন আবসারের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে গণসংগীতের ভুবনে। তিনি বিশ্বাস করতেন গান মানুষের সংগ্রামের ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা, আবার একই সঙ্গে ভালোবাসা ও মানবতার ভাষাও।
তার কণ্ঠে ‘চল রে ভাই, উজান বেয়ে যাই’, ‘আমি কোনো ভালোবাসার গল্প জানি না, যেটুকু জেনেছি সবটুকুই যুদ্ধের’ কিংবা ‘তোমরা যদি বলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, আমি মানবো না’ শুধু গান হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের সংগ্রামী চেতনার অংশ।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছেন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে। লেখক শিবিরের সংগীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। সত্তরের দশকের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তিনি গান গেয়ে তহবিল সংগ্রহ করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রাজপথে ছিলেন প্রতিবাদী শিল্পীদের অগ্রভাগে। তার কণ্ঠে গণসংগীত আন্দোলনরত মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
পরবর্তী সময়েও গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তার প্রকাশিত অ্যালবামের মধ্যে ‘মে দিবসের গান’ এবং ‘বাংলার কমরেড বন্ধু’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি তিনি নিজে বহু গণসংগীত রচনা ও সুরারোপ করেছেন। গণসংগীতের বাইরে শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সুকুমার বড়ুয়াসহ বহু কবি ও ছড়াকারের শতাধিক ছড়ায় সুর দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’র সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গানের দল ‘সৃজন’। গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক জোট ‘সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।






