সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
আমলানির্ভর স্মরণ, আয়োজক নিজেই অতিথি

ছবি: আগামীর সময়
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলা একাডেমির একটি বিষয়ভিত্তিক সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। তার অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে বিরক্ত হয়ে মঞ্চেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মফিদুল হক। তিনি বলেছিলেন, ‘বিষয়ভিত্তিক সেমিনারে বিশেষজ্ঞ কাউকে বক্তা মনোনীত করা উচিত। না হলে সরকারি টাকা খরচ করে এসব অনুষ্ঠান করার কোনো সার্থকতা তৈরি হয় না।’
চব্বিশের গণঅভ্যুথানের পর বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ও অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা কমবে বলে অনেকে ধারণা করলেও, বাস্তবে হয়েছে উল্টো। বরং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও দেখা যাচ্ছে অতিথির চেয়ারে। এ যেন নিজেই আয়োজক, নিজেই অতিথি। এ বিষয়টিকে মফিদুল হক বলছেন, ‘দুঃখজনক প্রবণতা’।
সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকে স্মরণ করে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠান আয়োজন করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহা. খালিদ হোসেন। আর বিশেষ অতিথির চেয়ারে বসেছিলেন আয়োজক প্রতিষ্ঠানেরই পরিচালক কে এম আল-আমীন।
মুখ্য আলোচক জেহাদ উদ্দিনও ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। স্বাগত বক্তব্য দেন উপপরিচালক সুবর্ণা শিরিন। সভাপতিত্ব করেন নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী। সংগীত প্রশিক্ষক ছন্দা চক্রবর্তী ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা গান শোনান। সঞ্চালনা করেন সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল আলম।
এই স্মরণানুষ্ঠানে পরিবারের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ইব্রাহীম খাঁর নাতি মোসাদ্দেক হাবিব। তিনি ইব্রাহীম খাঁর মেয়ে খালেদা হাবিবের ছেলে। ইব্রাহীম খাঁ ফাউন্ডেশনেরও সভাপতির দায়িত্বে আছেন তিনি।
মোসাদ্দেক হাবিব আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ইব্রাহীম খাঁর উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের পরিবারের কেউ দাওয়াত পাইনি। আমার মা ছিলেন ইব্রাহীম খাঁ ফাউন্ডেশনের সভাপতি, এখন আমি সভাপতির দায়িত্বে আছি। সাধারণত ইব্রাহীম খাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হলে ফাউন্ডেশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমাদের জানানো হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক কে এম আল-আমীন আগামীর সময়কে বললেন, ‘ইব্রাহীম খাঁর পরিবারের কেউ বেঁচে আছেন কি না, তা আমাদের নলেজে নেই।’ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়েও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হওয়ার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
এদিকে মোসাদ্দেক হাবিব বললেন, ‘আমার এক বোন গুলতেকিন খান তো সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত নাম। তাকেও তো দাওয়াত করা হয়নি।’
শুধু নজরুল ইনস্টিটিউট নয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ১৮টি দপ্তর বা সংস্থা আয়োজিত প্রায় সব অনুষ্ঠানেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অতিথি করা যেন এখন অনেকটা বাধ্যতামূলক। নাম প্রকাশ না করে শিল্পকলা একাডেমির এক কর্মকর্তা বলেছেন, শিল্পকলা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এখন পুরোপুরি মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলছে। সব অনুষ্ঠানই হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এবং সেখানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অতিথি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমি ৪৪ গুণীকে স্মরণ করে ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এই আয়োজনের উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। এ ছাড়া প্রতিদিনের আয়োজনেই অতিথি হতে দেখা যায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের।
গবেষক মফিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটা তো দুঃখজনক প্রবণতা। বুদ্ধিবৃত্তিকজগতে পদাধিকার বলে কেউ কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে না। পদাধিকারী কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় মেধাবী হতে পারেন। তারা যথাযথ সম্মানও পান। সেটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের জন্যই। এ বোধটুকু আমাদের প্রশাসনে সঞ্চারিত হবে বলে প্রত্যাশা করি।’
গত শনিবার কবি জীবনানন্দ দাশ, কবি আল মাহমুদ, লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ এবং কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম স্মরণে সেমিনার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এই আয়োজনের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। এক দিনেই কেন চারটি বিষয়ভিত্তিক সেমিনার? তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই বাজেটের টাকা খরচ করতে তড়িঘড়ি সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
মন্ত্রণালয়ে গত ১৯ নভেম্বরের একটি সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের ১৮টি দপ্তর বা সংস্থা থেকে ৩৮২ গুণীজনের নামের তালিকা করা হয়। এর মধ্য থেকে ১৮২ গুণীজনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পরে তাদের নিয়ে বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থায় ‘মনীষীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় মনীষীদের শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২০ মে আরেকটি সভায় মনীষীদের শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচিত তালিকা পুনর্বিবেচনা এবং অনুষ্ঠানের বাজেট পর্যালোচনা করা হয়। সেই সভায় আগের তালিকা থেকে শুধু একটি নাম পরিবর্তন করা হয়, অনুষ্ঠানে মনীষীদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা স্মারক দেওয়া, মনীষীদের জন্মস্থানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা এবং জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই আয়োজিত হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থার অভ্যন্তরীণ মিলনায়তনে। যেখানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার কর্মী ছাড়া তেমন দর্শক-শ্রোতাও যাচ্ছেন না। এমনকি অনেক অনুষ্ঠানে মনীষীদের পরিবারের সদস্যরাও আমন্ত্রণ পাচ্ছেন না।
গুণীজন স্মরণ অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানতে মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলাকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও ফোন ধরেননি।
তবে গত শনিবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত সেমিনার সিরিজের উদ্বোধনী পর্বের বক্তব্যে সংস্কৃতি সচিব বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের পথিকৃৎ গুণীজনদের স্মরণে বছরব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলা একাডেমিসহ মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানী এবং এর বাইরে গুণীজনদের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে স্মরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করছে।’




