গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন
অভিযোগে অনড় মামুনুর রশীদ, নাকচ কামাল বায়েজীদের

মামুনুর রশীদ ও কামাল বায়েজীদ
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে ঘিরে সরকারি অনুদান বণ্টন, সাংগঠনিক বৈধতা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে নাট্যাঙ্গনের বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। আগামীর সময়-এ প্রকাশিত ‘ফেডারেশনের অনুদান নিয়ে প্রশ্ন, প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি মামুনুর রশীদের’ শীর্ষক সংবাদের পর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ।
চিঠিতে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের অভিযোগকে ‘একপাক্ষিক, বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে দাবি করেছেন তিনি। কামাল বায়েজীদ ভাষ্য, ‘গত ৩ জুলাই আগামীর সময়ে ‘ফেডারেশনের অনুদান নিয়ে প্রশ্ন, প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি মামুনুর রশীদের’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি না লিখলে জানতেই পারতাম না গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন নিয়ে শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদের এত ক্ষোভ রয়েছে। এত ক্ষোভ কেন মামুন ভাইয়ের?’
অন্যদিকে মামুনুর রশীদ বলছেন, ‘আমার আপত্তি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে কেন্দ্র করে নয়; বরং অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছি।’ তিনি জানান, ১৯৮১ সালে ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি এবং পরে চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। তার ভাষায়, দেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম এই সংগঠনে অনিয়ম ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে সে বিষয়ে কথা বলা আমার দায়িত্ব।
সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুকূলে অনুদান বরাদ্দ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় সংস্কৃতি অঙ্গনে। গত ২৫ জুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে ফেডারেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং সরকারি অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আগামীর সময়ের হাতে আসা ওই চিঠিতে মামুনুর রশীদ দাবি করেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি পক্ষ ফেডারেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ফেডারেশনকে দেওয়া ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সরকারি অনুদানের ব্যবহার ও হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অনুদান বণ্টনের অভিযোগ তদন্ত করে বরাদ্দ পুনর্মূল্যায়নেরও আহ্বান জানান তিনি।
ফেডারেশনের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
কামাল বায়েজীদ বলেছেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংকটময় সময়ে ফেডারেশনই মামুনুর রশীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। শিল্পকলা একাডেমিতে তার নাট্যচর্চা বন্ধের উদ্যোগের বিরুদ্ধে ফেডারেশন লিখিত প্রতিবাদ জানায় এবং নিরাপদ সাংস্কৃতিক পরিবেশের দাবিতে কর্মসূচি পালন করে।’ ফেডারেশনের উদ্যোগেই জাতীয় নাট্যশালা পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবিও করেন কামাল বায়েজীদ। একই সাথে ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর ১৮৫টি সদস্য সংগঠনের উপস্থিতিতে জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ারও দাবি করেন তিনি।
ওই সম্মেলনে মামুনুর রশীদকে নির্বাচন পরিচালনা ও গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক করা হলেও ফেডারেশনের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন কামাল বায়েজীদ। তার ভাষ্য, ফেডারেশন একটি গণতান্ত্রিক ও গঠনতন্ত্রনির্ভর সংগঠন। সংগঠনের যেকোনো সিদ্ধান্ত, নির্বাচন কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রম গঠনতন্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরামের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলে তা সংগঠনের নির্ধারিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করাই সমীচীন।
অন্যদিকে মামুনুর রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর আমাকে আহ্বায়ক করে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির ওপর ফেডারেশনকে পুনর্গঠন ও সংস্কারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই সংস্কার কার্যক্রম গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা থেকে শুরু করে সদস্যপদ যাচাই-বাছাই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ফেডারেশন পুনর্গঠনের বিষয়ে সব নীতিগত সিদ্ধান্ত আহ্বায়ক কমিটিই নেবে এবং কেন্দ্রীয় কমিটি কেবল নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে ও আহ্বায়ক কমিটিকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু বাস্তবে কাজের পদ্ধতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কিছু সংঘাত তৈরি হয়।’
মামুনুর রশীদের অভিযোগ, ‘কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু সদস্য আহ্বায়ক কমিটির দায়িত্বের মধ্যেই আলাদাভাবে সদস্য সংগঠনগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। এতে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এ বিষয়ে তিনটি যৌথ সভা হলেও সমাধান না হওয়ায় আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ফেডারেশন আবার আগের অনিয়মতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হতে থাকে।’
সরকারি অনুদান বন্টনে অনিয়মের অভিযোগ
সরকারি অনুদান বণ্টন সম্পর্কে যে অভিযোগ এসেছে, তা ‘অজ্ঞতা প্রসূত’ দাবি করে কামাল বায়েজীদ বলেছেন, ‘সাংস্কৃতিক অনুদান নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন করা উচিত এবং প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তা নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা দায়িত্বশীল আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ও দুঃখজনকও বটে।’
এদিকে অনিয়মের অভিযোগে অনড় মামুনুর রশীদ বলেছেন, ‘অনুদান বণ্টনে যেসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে, সেগুলো আমি সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। একই সঙ্গে অনুদান বণ্টনে বঞ্চিত বিভিন্ন নাট্যদলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অভিযোগ প্রকাশ করেছে। অনুদান বণ্টনের তালিকা পর্যালোচনা করলেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে।’
ফেডারেশনে অস্থিরতার শুরু যেভাবে
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক মাসুদ আলম বাবুর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও সাংগঠনিক স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে’ সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ ও অর্থ সম্পাদক রফিকুল্লাহ সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে কামাল বায়েজীদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি দাবি করেন, ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া অগণতান্ত্রিক। ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
এই ঘটনার পর নাট্যকর্মীদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লেখেন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার। থিয়েটারবিষয়ক পত্রিকা ক্ষ্যাপা–র ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিদের এই বিরোধ জনসমক্ষে নাট্যকর্মীদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে কালিমালিপ্ত করেছে। এর দায় নাট্যকর্মীরা কেন নেবেন? তারা সুন্দর পরিবেশে নাটক করতে চান, নোংরা রাজনীতি চান না।’
তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেডারেশনের কর্মকাণ্ড এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত করারও পরামর্শ দেন। তবে তার এ আহ্বানকে গুরুত্ব না দিয়ে ফেডারেশনের তৎকালীন নেতৃত্বের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সমালোচনা করেন। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়, সংগঠনটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর লিয়াকত আলী লাকীকে আর প্রকাশ্যে দেখা না যাওয়ায় ফেডারেশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।








