দম ফুরাচ্ছে ফিলিং স্টেশনে
- স্টেশনে ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড
- পাম্পের বাইরে দীর্ঘ সারি যানবাহনের

দেশের কোথাও যদি রাস্তার এক ধারজুড়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখতে পান, তাহলে নিশ্চিত থাকুন কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা মিলবে একটি ফিলিং স্টেশনের। অবশ্য এটি সবসময়ের চিত্র নয়। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটই এই সমস্যার উৎস।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বা ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন আসলেই কতদিন চলবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তাই চলমান জ্বালানি সংকট যে সহসাই দূর হবে, করা যাচ্ছে না এমন প্রত্যাশাও।
কেবল ঢাকা নয়, দেশের প্রায় সব স্থানেই ফিলিং স্টেশনের বাইরের দৃশ্য এখন একই রকম। আবার সরবরাহ কম থাকায় অনেক স্টেশনের বাইরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। যার কারণে, সরকারের আশ্বাসবাণী থাকার পরও সাধারণ মানুষে কমছে না দুশ্চিন্তা।
ঢাকার আসাদ গেট এবং মোহাম্মদপুর এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা মিলল দীর্ঘসময় অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের ক্লান্ত চালকদের। যাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেই বেরিয়ে এলো ব্যক্তিগত ক্ষোভ, দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কার কথা।
তালুকদার এবং সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের বাইরে ছিল বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের কয়েক মাইল দীর্ঘ সারি। যার বেশিরভাগই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। রোদ, গরম, বৃষ্টির সম্ভাবনা সব একপাশে রেখে যাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে কয়েক লিটার তেলের জন্য।
মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু পর আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হয় এক ধরনের অস্থিরতা। যে খবর বাংলাদেশে পৌঁছতেই দেশের ভোক্তাদের মধ্যে শুরু হয় ‘প্যানিক বায়িং’। মূলত যেকোনো সময় সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই এই অতিরিক্ত তেল মজুদের প্রবণতা। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকজন চালক অভিযোগ করে বলছিলেন, কিছু মানুষ বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন। তারা সকালের দিকে একবার গাড়িতে তেল নিয়ে গিয়ে তা বাড়িতে মজুদ করে রেখে এসে ফের তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এতে যাদের তেল জরুরি প্রয়োজন, তারা হচ্ছেন বঞ্চিত।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বলে জানালেন মোটরসাইকেল চালক সেলিম শিকদার (৩৭)। তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। আগামীর সময়কে জানালেন, ‘অন্য পাম্পগুলোয় লাইন আরও বড়। কতদিন যে এভাবে লাইনে দাঁড়াতে হবে আল্লাহই জানেন। এই যে প্রতিদিন তেলের সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? এই সময়টুকু রাইড শেয়ারিং করতে পারলে আমার আয় বাড়ত, পরিবার নিয়ে আরামে চলতে পারতাম।’
একই সারিতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন মাখতাব উদ্দীন (৪৩)। তার সঙ্গে যখন কথা হয় তখন বেলা সাড়ে ৩টা। সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন জানিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘মোটরসাইকেলে তেল নেওয়া তাও সহজ, গাড়ির লাইনে সময় লাগছে কয়েক গুণ। আবার এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও পাম্প থেকে মাত্র দুই হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে কয়েকদিন পরপরই ফিরে আসতে হচ্ছে এই নরক যন্ত্রণায়।’
তেল নিতে এলে সারাদিন কেটে যায় জানিয়ে মাখতাম বলছিলেন, ‘যেদিন তেল নিতে আসি, সেদিন আর কোনো কাজ করতে পারি না। এভাবে কি চলে?’
এমন বাস্তবতায় গত বৃহস্পতিবারই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছিলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিকল্প উৎস থেকেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যার মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জ্বালানি আমদানির।
তারপরেও কেন তেলের সংকট, কেনই বা জ্বালানির অপেক্ষায় এত দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে; তা জানতে কথা হয় ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে।
ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের অভিযোগ, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই কম। যেহেতু তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না, তাই স্বাভাবিকভাবেই গ্রাহকদের আগের মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সরবরাহ কম থাকায় কিছু পাম্প দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টাই খোলা রাখা যাচ্ছে। যার রেশ পড়ছে জনজীবনে, তৈরি হচ্ছে এক ধরনের স্থবিরতা।
এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব কমাতে এরই মধ্যে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট খোলা-বন্ধের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সরকার জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সঙ্গে বিয়ে বা উৎসবে কোনো আলোকসজ্জা না করতে বলা হয়েছে। যার কারণে গত ঈদের সময় আলোকসজ্জা শুরু করেও পরে বন্ধ করে দেয় বিপণিবিতানগুলো।















