বিদ্যুৎমন্ত্রী
সংসদের আগামী অধিবেশনেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ আইন

সংগৃহীত ছবি
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সংসদের আগামী অধিবেশনেই এ-সংক্রান্ত আইন পাস করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি চাপে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘আবাসিক ছাদে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। নিউ এজ ও কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এক দিনে সমাধান হবে না। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ সহনীয় রাখতে সরকার নিরলস চেষ্টা চালাচ্ছে। নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা নির্বাচিত সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। জ্বালানির ঘাটতি কমাতে আরও ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ভালুকায় গৃহস্থালি পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি চালু হয়েছে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এসব ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য ৮ হাজার ৬০০ সেবাদাতাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা ভবনের পৌরকর কমানোর বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
সৌর প্যানেলের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের মান নিশ্চিত করতে সরকার সজাগ ও সক্রিয় রয়েছে। জনস্বার্থে এ বিষয়ে বিশেষ নজরদারি থাকবে। তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন জটিল কোনো কাজ নয়। এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী। তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুতের বড় অংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। তাই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। এ খাতে অর্থায়নের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বর্তমানে এ তহবিলের পরিমাণ মাত্র প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
হাসান মেহেদী বলেন, এক লাখ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রতি কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বছরে ২৯ হাজার ৬০০ থেকে ৩১ হাজার ৩০০ টাকার আমদানি সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে প্রায় ১ দশমিক ৪ টন। দক্ষ কারিগরের অভাবে চীন ও ভারত থেকে কর্মী আনতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি তরুণদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে কোন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং কোনটি এড়িয়ে চলা উচিত, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তথ্যভিত্তিক আলোচনা জরুরি।
ইডকলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান জানান, আগামী ছয় মাসে আবাসিক ভবন ও শিল্পকারখানার ছাদে ৫০০ মেগাওয়াট করে মোট এক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫৬ শতাংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। এ চাহিদা বছরে প্রায় ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। ৫০০ মেগাওয়াট আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বছরে প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এতে সাশ্রয় হবে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
ব্রাইট গ্রিন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক সব নীতিমালা একীভূত করে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। গ্রামীণ পরিবারগুলোকে দেশের প্রায় ১০ হাজার ব্যাংক শাখার মাধ্যমে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা অব্যাহত রাখা, সহজ অর্থায়ন ও স্থিতিশীল নীতিমালা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট হ্যামিলটন বলেন, সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মান নিশ্চিত করা না গেলে পুরো উদ্যোগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ওঠানামা সামাল দিতে ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।
র্যানকনের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সুবাইল বিন আলম বলেন, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই না করে সৌর প্যানেল স্থাপন করলে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো ভবন ও টিনের চালায় প্যানেল বসানোর আগে কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন। পুরোনো আমদানি করা প্যানেল নতুন পণ্য হিসেবে বিক্রি ঠেকাতেও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন তিনি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নেওয়াজুল মওলা এবং এমিনেন্সের শামীম হায়দার তালুকদার।




