ফুটপাতের চাঁদাবাজি দ্বন্দ্বে বিল্লাল খুন

নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার
ঢাকার মৌচাকে সালিশ বৈঠকে কথা-কাটাকাটির জেরে ছুরির আঘাতে নিহত হয়েছিলেন সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন। ঘটনার পরদিন জানা গেল, সেই কথা-কাটাকাটি ছিল ফুটপাতে চাঁদাবাজি কেন্দ্র করে। অর্থাৎ চাঁদাবাজি নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্বই প্রাণ নিয়েছে বিল্লালের। তাকে হত্যায় অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম আসছে, তারাও বিএনপির আরেক অঙ্গসংগঠন যুবদলের সদস্য।
বিল্লাল হত্যার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তারা হলেন ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আল-আমিন ও রিয়াজুল।
হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানালেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হত্যাকাণ্ডে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তারে চলছে অভিযান। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদেরও গ্রেপ্তার করা যাবে, আশা তার।
হত্যার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এখনো এ বিষয়ে কথা বলার মতো সময় হয়নি। আমরা এখন আসামিদের গ্রেপ্তারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।’
এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় আনারকলি মার্কেটের সামনে ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হন রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহত বিল্লালের স্ত্রী আম্বিয়া বেগম বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সঙ্গে অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ জনের কথা। আম্বিয়া বেগমের দাবি, চাঁদাবাজির ঘটনায় বাধা দেওয়ায় বিল্লালকে হত্যা করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হয় বিল্লালের জানাজা। সেখানে তার ছেলে ওমর ফারুক জানালেন, তার সামনেই ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বাবাকে। সেখান থেকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার কোলেই মারা গেছেন বিল্লাল।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বললেন, ‘গত রাতে একজন আমাকে ফোন করে জানায়, বাবার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার বাবা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছেন এবং বাবুর লোকজনদের বুঝিয়ে বলছেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে হঠাৎ অন্য পক্ষের একজন আমার বাবার গায়ে হাত তোলে। এরপরই দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। এ সময় বাবু একটা ছুরি দিয়ে বাবাকে আঘাত করার চেষ্টা করে। পরে ছুরিটা নিয়ে কালো গেঞ্জি পরা রিয়াজুল বাবার বুকে আঘাত করে।’
স্থানীয়রা বলছেন, আনারকলি মার্কেটের সামনে ও মৌচাক এলাকায় ফুটপাতের চাঁদাবাজি কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঝামেলা হয়ে আসছিল। তাদের দাবি, এই এলাকার ফুটপাতের দোকানপাট থেকে বিদ্যুৎ, দারোয়ান ও ঝাড়ু দেওয়া নামে প্রতিদিন মাসিক চাঁদা আদায় করেন যুবদল নেতা বাবুর অনুসারী সিরাজ ও রিয়াজুল। চাঁদাবাজির ঘটনায় একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৩১ মে বাবুর অনুসারী ফুটপাত চাঁদাবাজির লাইনম্যান সিরাজকে চড় দেন রমনা থানা বিএনপির সভাপতি আশরাফুল। সেই সঙ্গে তিনি তাদের মার্কেট এলাকায় যেতেও নিষেধ করেন। এরপর ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আবারও সিরাজ ও রিয়াজুল আনারকলি মার্কেটের সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করার সময় বিল্লালের ভাগ্নে মোবারক হোসেন আকাশ বাধা দেয়। এ সময় আকাশকে মারধর করে আটকে রাখেন বাবুর অনুসারীরা। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আনারকলি মার্কেটের সামনের পার্কিংয়ের ফাঁকা জায়গায় বিল্লাল ও বাবুর লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ পর্যায়ে বিল্লাল খুন হন।
মূলত ফুটপাতের দোকানপাট নিয়ে ঝামেলা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘একতরফাভাবে একটি সন্ত্রাসী চক্র এটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে আনারকলির ফুটপাতের জায়গাটুকু এ পর্যন্ত আমরা তিনবার উচ্ছেদ করেছি। এই সন্ত্রাসী চক্রটিই আবার ফুটপাতে দোকান বসিয়ে দিয়েছে। দোকান বসানোর কারণেই এ হত্যাকাণ্ড।’
স্থানীয় এক বিএনপি নেতার দাবি, আগে যুবলীগ নেতা মাসুদের যে চাঁদাবাজির কাঠামো বা সিস্টেম ছিল, সেটি এখনো বিদ্যমান। শুধু নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে। বিল্লাল হত্যার পর রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।




