যে জাদুঘরের নাম জানে না কেউ
- অযত্ন-অবহেলার ছাপ পরতে পরতে
- নেই প্রচার, নেই আলোচনাও
- কর্মকর্তাদের দিন কাটে গল্পে-আলস্যে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরিসংখ্যান। শব্দটি শুনতেই খটোমটো। অথচ সেই পরিসংখ্যানের নাম নিয়েই আস্ত একটি জাদুঘর রয়েছে দেশে। যদিও বেশিরভাগ মানুষের কাছেই তা অজানা। অবশ্য জাদুঘরটিও যে দশা, তাতে সেটি আদৌ ‘জাদুঘর’ নাকি পুরনো যন্ত্রপাতির ডাম্পিং গ্রাউন্ড, তা নিয়ে জাগে সংশয়।
পরতে পরতে অযত্ন আর অবহেলার ছাপ নিয়ে টিকে থাকা বিবিএসের এই জাদুঘরটির অবস্থান ঢাকার আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনের নিচতলায়। ২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর যার উদ্বোধন করেছিলেন তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত এয়ারভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার।
দৃশ্যত বাইরে থেকে অবস্থা তাও কিছুটা ফিটফাট, ভেতরের পরিস্থিতি ‘সদরঘাট’। ঢুকেই মনে হবে, পুরনো যন্ত্রাংশের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে এসে পড়েছেন। অবশ্য আসেই বা কে এখানে! নেই এটি নিয়ে কোনো প্রচার, নেই কোনো আলোচনা, যার প্রমাণ মেলে দর্শনার্থীর সংখ্যায়। গত ৩ বছর ৪ মাসে জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন মাত্র ২৩২ দর্শনার্থী। মন্তব্য খাতা ঘেঁটে এমন তথ্যই মিলল।
সোমবার জাদুঘরে গিয়ে দেখা গেল, দায়িত্ব পালন করছেন বিবিএসের কম্পিউটার উইংয়ের দুই কর্মকর্তা। প্রায় দর্শনার্থীশূন্য কর্মস্থলে তাদের দিন কাটে আলস্যে।
মূল ফটকের বাম দিকে লাগানো নামফলক, অবশ্য সেটি পড়তে বেশ কষ্ট হবে। কেননা, ফলকের অনেক অক্ষরই হারিয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল আলো-আঁধারির খেলা, নীরবতা যেখানে নিত্যসঙ্গী। প্রথমে দায়িত্বশীল কাউকেই চোখে পড়ল না। কিছু দূর এগোতেই মাঝ সারিতে দেখা হলো এক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে। পর্যাপ্ত আলো কেন নেই— জানতে চাইলে তিনি জানালেন বাতি কমিয়ে রাখার সরকারি নির্দেশনার কথা।
কিন্তু আলো কমিয়ে এমন অবস্থায় রাখা হয়েছে যে, জাদুঘরের মাঝে বিশাল আকৃতির একটি যন্ত্রের কাছে গিয়ে পড়াই গেল না যে, সেখানে কী লেখা আছে। ফলে যন্ত্রটি আসলে কী কাজে ব্যবহৃত হতো, তা না জেনেই ফিরে আসতে হলো। সঙ্গে থাকা বিবিএসের এডিটিং অ্যান্ড কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট রওশন আরা জানালেন, সেখানে যে বাল্বটি ছিল, তা বহুদিন ধরেই নষ্ট।
প্রদর্শিত যন্ত্রগুলোতে দেখা গেল ধুলার আস্তরণ। এমনকি পরিচিতি বোর্ডগুলোর ওপরও এত নোংরা যে, সেগুলো পড়া যায় না। কোনো কোনোটিতে তো রীতিমতো বাসা বেঁধেছে মাকড়সা।
জাদুঘরের ভেতরের একটি ছোট কক্ষে বসে এক সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলেন সহকারী পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. শাহ আলম।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কিছুটা সতর্ক হলো তার দৃষ্টি। বললেন, ‘বিবিএসের কম্পিউটার উইংয়ের পরিচালক কবীর উদ্দিন এটির দেখভাল করেন। তিনি বর্তমানে হজ পালনে সৌদি আরবে আছেন।’
জাদুঘরটির এই দুরবস্থার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হলেন না। তবে জানালেন, মাঝেমধ্যে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসেন। জাদুঘরটির যে কোনো প্রচার নেই, সে বিষয়টিও স্বীকার করে নিলেন। ছবি তুলতে চাইলে অনুমতি দেননি তিনি। তাই প্রতিবেদনের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই গোপনে কিছু ছবি তুলতে হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কী আছে পরিসংখ্যান জাদুঘরে? কেন সেটি পরিদর্শন করতে আগ্রহী হবে মানুষ? জবাব মেলে এর সংগ্রহশালার দিকে চোখ ফেরালে। বাংলাদেশের প্রথম দুটি কম্পিউটারের মধ্যে একটি রয়েছে সেখানে। কম্পিউটারটি আকারে বিশাল, দেখতে অনেকটা এখনকার বড় জেনারেটরের মতো। মোট ছয়টি বড় বড় আলাদা যন্ত্রের সমন্বয় হলো এই কম্পিউটার। এর দুদিকেই আছে দুটি মনিটর। দুজন একসঙ্গে বসে কাজ করতে হতো। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এটি ব্যবহার করে পরিসংখ্যান ব্যুরো।
ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বর্তমান প্রজন্ম হয়তো কল্পনাই করতে পারবে না যে, এটি আসলেই একটি কম্পিউটার, যা দেখলে প্রযুক্তির বিবর্তন তাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। এ ছাড়া জাদুঘরে আছে সাইক্লোস্টাইল কপিয়ার মেশিন। টাইপ রাইটার থেকে এখানে রঙ দিয়ে প্রিন্ট বের করা হতো। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা হয়।
আরও আছে অপটিক্যাল মার্ক রিডার। এটি ২০০১ সাল পর্যন্ত সচল ছিল। প্লেট মেকার মেশিনটি ব্যবহার করা হয় ১৯৮০-৯০ সাল পর্যন্ত। লাইন প্রিন্টারটি চলেছিল ২০১০ সাল পর্যন্ত, অ্যামোনিয়া প্রিন্টার চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। জাদুঘরে রয়েছে ২০০১ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করা ডিজিটাইজার, ডেটা প্রসেসর ইউনিট, বেশ কিছু বড় বড় ফ্যাসিট ক্যালকুলেটরসহ অতীতে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন অকেজো যন্ত্র। যেগুলো যত্নের অভাবে দিনদিন ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। অবশ্য পরিসংখ্যান জাদুঘরে শুধু বিবিএসের ব্যবহার করা পুরনো যন্ত্রপাতিরই দেখা মিলবে। আপনি যদি ভেবে থাকেন, সেখানে পাবেন পুরনো বিভিন্ন পরিসংখ্যানের দলিল, তাহলে হতাশ হতে হবে আপনাকে।
জাদুঘরটির এমন দশা কেন, জানতে চাই বিবিএসের এফএ অ্যান্ড এমআইএস উইংয়ের পরিচালক মো. আরিফুল ইসলামের কাছে। তিনিও স্বীকার করলেন জাদুঘরটির বেহাল দশার কথা। তবে বললেন, ‘আপনারা (সাংবাদিকরা) আসা-যাওয়া করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’ অবশ্য দ্রুত জাদুঘরটির দিকে নজর দেওয়া হবে বলে কথা শেষে আশ্বস্তও করলেন।







