পাহাড়ি ঢল-বৃষ্টিতে ৭ জেলা তলিয়ে, প্রাণহানি বেড়ে ৫১

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টানা অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের সাতটি জেলায় নেমে এসেছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৮টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন বন্যার পানিতে ভাসছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় দেশজুড়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে কক্সবাজারেই স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা মিলে মারা গেছেন ২৮ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন।
গত এক সপ্তাহে কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই রেকর্ড ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার মধ্যে গত মঙ্গলবার এক দিনেই ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এই নজিরবিহীন বৃষ্টির তোড়ে তলিয়ে গেছে একের পর এক গ্রাম। চোখের পলকে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর দুই শিশু আশিক (৭) ও মিরাজ (৩)।
সরকারি হিসাবে, এই মুহূর্তে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩। প্লাবিত এলাকার ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ঠাঁই নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। নদীগুলোর পানি এখনো বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যার মধ্যে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মনু, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদী অন্যতম।
সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে
বন্যা ও পাহাড়ধস শুধু প্রাণই কেড়ে নেয়নি, হাজারো পরিবারকে এক রাতে পথে নামিয়েছে। বাঁশখালীর বোচারপাড়ার দিনমজুর আবদুল কাদেরের মাটির ঘরটি পাহাড়ি ঢলে ধসে পড়েছে। তার স্ত্রী রিনা আক্তার চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘বুধবার রাতে হঠাৎ বন্যার ঢল এল। মুহূর্তেই ঘর তলিয়ে গেল। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হয়ে আসি। এখন কোথায় থাকব, কী খাব— কিছুই জানি না।’ দিনমজুর দুই ভাইয়ের ১৫ জনের এই পরিবারটির নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করার মতো কোনো সামর্থ্য নেই।
ত্রাণ বরাদ্দের মাঝেও হাহাকার ও সমন্বয় সংকট
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যা দুর্গতদের জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলার জন্যই ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার টন চাল সরাসরি পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ চালাচ্ছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে এখনো বহু মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার বাসিন্দা সুকুমার আচার্যের স্ত্রী অর্পণা আচার্য জানান, ঘরের চুলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মুদি দোকান থেকে আনা শুকনো খাবার খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নেয়নি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠ প্রশাসনের পক্ষে এই বিশাল সংকট একা সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সংকট ত্রাণ বা টাকার নয়, আসল সমস্যা সমন্বয়ের। বিশেষ করে এই মুহূর্তে গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রবীণদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের উদ্ধার করে তাদের কাছে জরুরি ওষুধ, সুপেয় পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। আর এ কাজে রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা থাকলেও, নতুন করে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে তিস্তার পানি বেড়ে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৭ জেলার ক্ষতির চিত্র
বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রামে। জেলার ১৬টি উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দী হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার। জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ জন অবস্থান করছেন।
কক্সবাজারে ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী ৩৯ হাজার ৫০৬ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭। জেলায় স্থানীয় ও রোহিঙ্গা মিলে মোট ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৪ জন। এর মধ্যেও পাঁচ রোহিঙ্গা। জেলার ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
বান্দরবানে সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে পানিবন্দী ১২ হাজার ৫০০ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫০০। মারা গেছে ছয়জন। আহত হয়েছেন দুজন। ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৬ হাজার ২৫০ জন।
রাঙামাটিতে নয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দী ১ হাজার ৪৪টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছে ১ হাজার ৭৩টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। সেখানে একজন আহত হয়েছেন। জেলার ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী ৭ হাজার ৩০৮ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ২৬ হাজার ৫৪৪। মারা গেছেন একজন। জেলার ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
হবিগঞ্জের তিনটি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত। পানিবন্দী ৬ হাজার ৪৪৪ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ২৮ হাজার ১৪০। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে এখনো কেউ আশ্রয় নেননি।








