দেশে দেশে এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্তের ইঙ্গিত

এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম
এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম ওরফে এস আলমের পাচার করা অর্থ ফেরাতে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। এজন্য ৯ দেশে চিঠি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদ জব্দের ইঙ্গিতও মিলেছে। সব ঠিক থাকলে আইনিপ্রক্রিয়া মেনেই দেশে ফেরানো হবে পাচার হওয়া অর্থ।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কাজে নিয়োজিত কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা জানালেন, এস আলম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৪৭০টির বেশি শেল কোম্পানির মাধ্যমে সরাসরি ৯টি দেশে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। সেখান থেকে অন্তত ১১৭ দেশ ও অঞ্চলে পাচার করা হয়েছে অর্থ। আন্তর্জাতিক তদন্ত ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এস আলমের পাচার করা অর্থের তথ্য। যার পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া, সরকারের অনুরোধে সাইপ্রাসের একটি আদালত এস আলম এবং তার স্ত্রীর ৮০০ কোটি ইউরোর বাড়ি জব্দ করেছে, যার দাম প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি দপ্তর দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কাজ করছে। তাদের অনুসন্ধানেই উঠে এসেছে কানাডা, সুইজারল্যান্ডসহ ৯টি দেশে সম্পদ পাচারের তথ্য। এসব সম্পদ যেন অন্য কোথাও সরিয়ে না নেওয়া যায়, সে অনুরোধ করে দেশগুলোকে দেওয়া হয়েছে
চিঠি। দেশগুলো থেকে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে, দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
তারা বলছেন, এস আলম সিঙ্গাপুরে হোটেল, বাণিজ্যিক স্পেস ও আবাসন খাতে অন্তত ৭৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিলাসবহুল ভিলা ও আবাসন খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে মিলেছে ৭ মিলিয়ন পাউন্ডের ভিলাসহ অঢেল সম্পত্তির সন্ধান। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, ইতালি, তুরস্ক, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশ এবং ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে পরিচিত দেশেও রয়েছে তার বিপুল সম্পদ।
বিএফআইইউর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইপ্রাস, অ্যান্টিগুয়া, বারবুডা, ইতালি, তুরস্ক, জার্সি, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর এবং আইল অব ম্যানের মতো দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে। সেখানকার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এস আলম গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এসব দেশে বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে সাইফুল আলম বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে নিবন্ধিত ১৯টি কোম্পানি চিহ্নিত করা গেছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা) পর্যন্ত পাচার করেছেন।
গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছিলেন, ‘এস আলম ও বেক্সিমকোর পাচার করা অর্থ ফেরাতে ছয় দেশে আইনি চিঠি দেওয়া হয়েছে, নিয়োগ করা হয়েছে চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। সম্পদ উদ্ধারে দুটি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে সরকার। পাচারের অর্থ ফেরাতে একদিকে জি টু জি ভিত্তিতে সরকার কাজ করছে, অন্যদিকে রিকভারির জন্য নিয়োগ করা ফার্মগুলো কাজ করছে।’ এর মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো যাবে বলেও আশার কথা জানালেন তিনি।
শ্বেতপত্র ও সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৫ বছরে বিভিন্ন দেশে ২৩৪ বিলিয়ন (২৮ লাখ কোটি টাকা) ডলার পাচার করা হয়েছে। তার মধ্যে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ৯টি দেশে নিবন্ধিত কমপক্ষে ৪৭০টি ভুয়া কোম্পানির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা (প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার) পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২৭টি মামলা করেছে। অবরুদ্ধ করা হয়েছে তাদের ৫৩টি ব্যাংক হিসাব। পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে নিবিড়ভাবে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বললেন, ‘পাচারের টাকা ফেরত আনতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এ ধরনের অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামো অনুসরণ করেই এগোতে হয়। তাই সব বিধি মেনেই সম্পদ পুনরুদ্ধার করা হবে।’




