যদি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিট। কারওয়ান বাজারে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও চোখ আটকে গেল একটি পরিবারের দিকে তাকিয়ে। বহুদিন ধরে তাদের দেখে আসছি। ব্যস্ততম এই নগরে, দিনশেষে মেট্রোরেলের সিঁড়ির সামনে জাহাঙ্গীর টাওয়ারের নিচে প্রধান সড়কের পাশেই প্রতি রাতে তাদের অস্থায়ী সংসার গড়ে ওঠে।
পরিবারটিতে আছে একটি ছোট্ট শিশু। বয়স আনুমানিক তিন বছর। তাকে ঘিরেই যেন তাদের সমস্ত পৃথিবী। কখনো তাকে খাওয়াচ্ছেন, কখনো তার সঙ্গে খুনসুটি করছেন, কখনোবা বুকভরা আদরে ভরিয়ে দিচ্ছেন।
সেদিন একটি দৃশ্য আমাকে থমকে দিয়েছিল।
শিশুটিকে মা আদর করতে করতে বললেন, ‘কী, বড় হইয়া আমারে খাওয়াইবি না?’
শিশুটি শুধু অট্টহাসিতে মেতে রইল।
‘ওই কতা কস না ক্যা?’
আমি তার নাম জানতে চাইলাম।
হাসতে হাসতেই বলল,
‘আমার বাপজানের নাম কমু না।’
কথাগুলো হয়তো ছিল এলোমেলো, কিন্তু তাদের হাসি ছিল নির্মল। মা নিজের নাক ছুঁইয়ে দিলেন সন্তানের নাকে। শিশুটি আবারও হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল না দারিদ্র্যের হাহাকার, ছিল না ফুটপাতে রাত কাটানোর ক্লান্তি; ছিল শুধু নিখাদ ভালোবাসা।
আমি ভাবছিলাম, বাসায় ফিরে আমিও তো আমার সন্তানের সঙ্গে ঠিক এমনটাই করব।
আদর, ভালোবাসা আর স্নেহ— এসবে কোনো শ্রেণি নেই, কোনো ঠিকানা নেই। কান্নার যেমন আলাদা কোনো রঙ নেই, তেমনি আদরেরও নেই। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ধনী-গরিবের ব্যবধানে বদলায় না; বদলায় শুধু চারপাশের বাস্তবতা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল—
যদি!
এই মা, এই শিশুটি— তারা তো এই রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তাদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার দায়িত্বও এই রাষ্ট্রের, এই সমাজের।
ভাগ্যবদলের আশায় কত পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে। তারা বিশ্বাস করে, শহর মানেই সুযোগের দরজা। অথচ বাস্তবতার নির্মম আঘাতে সেই স্বপ্নের অনেকটাই ধুলায় মিশে যায়। ফুটপাতই হয়ে ওঠে ঠিকানা, আকাশই হয়ে ওঠে ছাদ।
বাংলাদেশের শহরগুলোয় অসংখ্য শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো— এসব সুবিধা তাদের চোখের সামনেই রয়েছে, অথচ নাগালের বাইরে।
তাদের শৈশব কেটে যায় রোগ, অনিশ্চয়তা, উচ্ছেদের ভয় আর বেঁচে থাকার প্রতিদিনের সংগ্রামের মধ্যে।
বাসায় ফিরতে ফিরতে বারবার মনে হচ্ছিল—
যদি!
এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুটিও একদিন সুবিধাভোগীদের কাতারে দাঁড়াতে পারত!
ইস!!




