বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ১০ ননস্টপ ফ্লাইট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আকাশপথে ‘সবচেয়ে লম্বা ফ্লাইট’ বলতে সাধারণত ননস্টপ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের গ্রেট সার্কেল দূরত্ব বোঝানো হয়। অর্থাৎ পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠ ধরে দুই বিমানবন্দরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সম্ভাব্য দূরত্ব। বাস্তবে আবহাওয়া, বাতাসের গতি, আকাশসীমা এড়ানো বা নিরাপত্তাজনিত কারণে উড়োজাহাজ আরও বেশি পথও পাড়ি দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘতম ফ্লাইটের তালিকা তৈরিতে সাধারণত এই গ্রেট সার্কেল দূরত্বকেই ভিত্তি ধরা হয়।
আকাশপথ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওএজি-এর হালনাগাদ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ দীর্ঘতম ননস্টপ বাণিজ্যিক রুটগুলোর সবই ১৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ। তালিকার শীর্ষে রয়েছে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর পর্যন্ত রুট। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস পরিচালিত এই রুটের দূরত্ব ১৫ হাজার ৩৩২ কিলোমিটার। এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ ইউএলআর উড়োজাহাজে পরিচালিত ফ্লাইটটি গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ১৮ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় নেয়।
দ্বিতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়ার্ক থেকে সিঙ্গাপুর রুট। এটিও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস পরিচালনা করে। রুটটির দূরত্ব ১৫ হাজার ৩২৯ কিলোমিটার, অর্থাৎ শীর্ষ রুটের চেয়ে মাত্র ৩ কিলোমিটার কম। এই ফ্লাইটও এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ ইউএলআর উড়োজাহাজে পরিচালিত হয়। নিউইয়র্ক ও নিউয়ার্ক থেকে সিঙ্গাপুরের এই দুই রুটই বর্তমানে দীর্ঘপাল্লার ননস্টপ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
তৃতীয় দীর্ঘতম ননস্টপ ফ্লাইট অকল্যান্ড থেকে দোহা। কাতার এয়ারওয়েজ পরিচালিত এই রুটের দূরত্ব ১৪ হাজার ৫২৬ কিলোমিটার। রুটটি এয়ারবাস এ৩৫০-১০০০ এবং বোয়িং ৭৭৭-২০০ এলআর উড়োজাহাজে পরিচালিত হয়। নিউজিল্যান্ড থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে এই রুট গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে লন্ডন হিথরো থেকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ রুট। কান্তাস এয়ারওয়েজ পরিচালিত এই ফ্লাইটের দূরত্ব ১৪ হাজার ৪৯৯ কিলোমিটার। বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার দিয়ে পরিচালিত এই রুট ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সরাসরি সংযোগের অন্যতম বড় দৃষ্টান্ত। আগে যেখানে এমন ভ্রমণে মাঝপথে বিরতি প্রায় অনিবার্য ছিল, এখন সেই পথ সরাসরি পাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পঞ্চম দীর্ঘতম ফ্লাইট যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন পর্যন্ত। কান্তাস এয়ারওয়েজের এই রুটের দূরত্ব ১৪ হাজার ৪৬৮ কিলোমিটার। রুটটিও বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল থেকে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে সরাসরি যাত্রার কারণে এটি দীর্ঘপাল্লার বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে একটি উল্লেখযোগ্য রুট।
ষষ্ঠ স্থানে আছে প্যারিস শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর থেকে পার্থ রুট। কান্তাস এয়ারওয়েজ পরিচালিত এই ফ্লাইটের দূরত্ব ১৪ হাজার ২৬৫ কিলোমিটার। বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে পরিচালিত এই রুট ২০২৪ সালে চালু হয়। ফলে দীর্ঘ দূরত্বের সরাসরি ফ্লাইটের তালিকায় এটি তুলনামূলক নতুন সংযোজন হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সপ্তম দীর্ঘতম ননস্টপ ফ্লাইট অকল্যান্ড থেকে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর পর্যন্ত। এয়ার নিউজিল্যান্ড ও কান্তাস এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। রুটটির দূরত্ব ১৪ হাজার ২০৯ কিলোমিটার। প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করা এই দীর্ঘ পথ নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বড় দৃষ্টান্ত।
অষ্টম স্থানে রয়েছে অকল্যান্ড থেকে দুবাই রুট। এমিরেটস পরিচালিত এই ফ্লাইটের দূরত্ব ১৪ হাজার ১৯৩ কিলোমিটার। তালিকার বেশির ভাগ রুটে যেখানে এয়ারবাস এ৩৫০ বা বোয়িং ৭৮৭ ব্যবহৃত হয়, সেখানে এই রুটে ব্যবহৃত হয় এয়ারবাস এ৩৮০-৮০০। বড় আকারের এই উড়োজাহাজে দীর্ঘপাল্লার যাত্রী পরিবহনে এমিরেটসের সক্ষমতা এই রুটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নবম দীর্ঘতম ননস্টপ রুট শেনঝেন থেকে মেক্সিকো সিটি। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস পরিচালিত এই রুটের দূরত্ব ১৪ হাজার ১২৪ কিলোমিটার। এয়ারবাস এ৩৫০ উড়োজাহাজে পরিচালিত এই পথ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের সরাসরি বিমান যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে এ ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। শেনঝেন থেকে মেক্সিকো সিটি ফ্লাইটটি ননস্টপ হলেও ফিরতি পথে মেক্সিকো সিটি থেকে শেনঝেন ফ্লাইটে টেকনিক্যাল স্টপ থাকতে পারে।
দশম স্থানে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সিঙ্গাপুর রুট। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস পরিচালিত এই ফ্লাইটের দূরত্ব ১৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজে পরিচালিত এই রুটও সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের দীর্ঘতম আকাশপথের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই তালিকা শুধু দূরত্বের হিসাব নয়, বিমান প্রযুক্তির অগ্রগতিরও ছবি। ২০০০ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দীর্ঘতম ননস্টপ রুটের গড় দূরত্ব ছিল ১২ হাজার ৬৬৭ কিলোমিটার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫০৪ কিলোমিটারে। অর্থাৎ ২৫ বছরে দীর্ঘপাল্লার ননস্টপ ফ্লাইটের গড় দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও দীর্ঘপাল্লার আধুনিক উড়োজাহাজ, বিশেষ করে এয়ারবাস এ৩৫০ ও বোয়িং ৭৮৭।
তবে ‘সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দূরত্বের হিসাবে তালিকা করলে নিউইয়র্ক জন এফ কেনেডি থেকে সিঙ্গাপুর রুটই বর্তমানে শীর্ষে। কিন্তু সময়ের হিসাবে কোনো কোনো ফ্লাইট বেশি দীর্ঘ হতে পারে, কারণ আবহাওয়া, বাতাসের গতি, আকাশসীমা এড়ানো বা নিরাপত্তাজনিত কারণে বাস্তবে উড়োজাহাজের পথ বদলাতে পারে। এ কারণে দীর্ঘতম ফ্লাইটের আন্তর্জাতিক তালিকায় সাধারণত গ্রেট সার্কেল দূরত্বকে ভিত্তি ধরা হয়।
সব মিলিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ফ্লাইটের তালিকা শুধু দূরত্বের গল্প নয়, এটি আধুনিক বিমান প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা, যাত্রী চাহিদা এবং বৈশ্বিক সংযোগেরও গল্প। যে পথ একসময় একাধিক বিরতি ছাড়া কল্পনাই করা যেত না, এখন সেই পথেই প্রায় ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা আকাশে ভেসে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পৌঁছে যাচ্ছে যাত্রীরা।






