‘আমি একটি কাঁচা রাস্তা’

গ্রাম্য পথ। ছবি: এআই
আমি নেহাতই একটি কাঁচা রাস্তা। গ্রামগঞ্জেই থাকি। কারও ঝুটঝামেলায় নেই। নীরবে আমার বুকের ওপর দিয়ে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ করে দিই।
তবে মাঝে মাঝে আমার পাকা থেকে কাঁচা হওয়ার সাধ জাগে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’
কবি হয়তো ‘কাঁচা’দের কথা বলতে গিয়ে কোথাও না কোথাও আমার কথাও সসম্মানে ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন।
সে যাই হোক, আমার পরম সৌভাগ্য যে জাতীয় সংসদে আমার নাম উঠেছে। কাঁচা রাস্তা নিয়ে সারা দেশে হইচই পড়ে গেছে।
আমার কথা বলতে গিয়ে সংসদে ইংরেজিতে বাতচিত হয়েছে। এ আমার পরম প্রাপ্তি, পরম সৌভাগ্য। কারণ চাষাভুষাদের পায়ের ছাপ আমার বুকে খচিত থাকে। আমি তাদের নিয়েই থাকি। গ্রামবাংলার মানুষের পায়ের মানচিত্র আঁকা আছে আমার বুকে। সিংহভাগ মানুষের ভাষা বাংলা। যার যার আঞ্চলিক উচ্চারণে, নিজস্ব শব্দে তারা আমাকে ডাকে।
শত বছরের এই একঘেয়েমির মধ্যে জাতীয় সংসদে উচ্চারিত হলো আমার নাম। এ কি আমার পরম আনন্দ নয়?
ইংরেজি জানা ব্যক্তির মুখ থেকে উচ্চারিত হলো ‘কাঁচা রাস্তা’। যদিও কাঁচা রাস্তার ইংরেজি তিনি বলতে পারেননি। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার ইংরেজি করতে পারলে আমি আরও খুশি হতাম।
আমরা কাঁচা রাস্তারা দুইশ বছর ইংরেজের গোলামি করেছি। ইংরেজ চলে গেলেও ইংরেজি ভাষা আমাদের ছাড়েনি। সংসদের ঐতিহাসিক এই দিনটির জন্য হয়তো ইংরেজি ভাষাও অপেক্ষা করছিল। অবশেষে সে সার্থক হলো—উচ্চারিত হলো ‘রাস্তায়াস’!
আমার বুকের ওপর দিয়ে এক কৃষক তার ইরি ধানের ক্ষেতে যাচ্ছিলেন। তার হাতে কাস্তে। বললাম—
‘দাঁড়াও, কৃষক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল।’
তিনি থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তাড়াতাড়ি কও, কী কইতে চাও? ঢল নামতেছে। পাকা ধান ডুইবা যাইতাছে। কাটতে হইবো।’
আমি শুধালাম, ‘তুমি কি জানো, সংসদে আমাকে নিয়ে কথাবার্তা হয়? শুধু কথাবার্তাই নয়, ইংরেজিতেও কথা হয়। জানো সেটা?’
আমার কথা শুনে কৃষক আর দাঁড়ালেন না। হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন। ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘আমার ধান ডুইবা যাইতাছে, আর তুমি আছো ইংরেজি নিয়া!’
আমি পুলকিত বোধ করি। আমার বুকের ওপর কাদা-পানি, আমি কর্দমাক্ত। তবু কী প্রশান্তি! আমার বুকের ওপর সাধারণ মানুষের পায়ের মানচিত্র।
আমার এই চেহারাসুরত নিয়ে, শত শত বছরের কাঁচা রাস্তার জীবন নিয়ে, সংসদে ঢুকতে পারতাম না।
একজন সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে আমার কথা তুলে ধরেছেন। আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ। তাকে আমি আমার কর্দমাক্ত হৃদয় থেকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।
এবার হয়তো আমার কাঁচা রাস্তা থেকে পাকা হওয়ার পালা। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার বুকের ওপর দিয়ে দামি দামি গাড়ি ছুটে যাচ্ছে—পাজেরো, আরও কত কী নাম যেন!
শুনেছি, পেট্রল আর অকটেনের গন্ধ নাকি খুবই মজার, খুবই মিষ্টি। সেদিন একজন কৃষকের ছেলে আমার ওপর দিয়ে যেতে যেতে কথাটা বলছিল।
সেই গন্ধ শুঁকতে আমার বড়ই সাধ হয়।




