এবং

প্রথমে ঢাকায় আসার পর শখ করে কমলাপুর রেলস্টেশন দেখতে গিয়েছিলাম। আরও একবার গিয়েছিলাম কোথায় যেন যাওয়ার জন্য। এরপর আর যাওয়া হয়নি। সেদিন কাজ না থাকায় ভাবলাম— যাই, ঘুরে আসি।
যেকোনো স্টেশনে গেলেই দেখা যায় যাত্রীদের ছোটাছুটি, এখানেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আমি ঢুকেই দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে গেলাম। দেখলাম, এক শিশু একটি ছেঁড়া প্যান্ট, পুরনো একটি কালো শার্ট পরে বসে আছে। আমিও ওর পাশে বসলাম। ওকে বুঝতে দিলাম না যে, ওর সঙ্গে কথা বলার জন্যই পাশে বসেছি।
একটু সময় নিয়ে জানতে চাইলাম, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে? বলল, ‘না।’ নাম কী? ‘রাব্বি।’ বয়স? ‘১১-১২ হবে।’ খুব সাবলীল উত্তর।
আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেও তার চোখ তখন নতুন কোনো রেল আসছে কি না, সেদিকে। কোথায় থাকো? ‘এইহানেই, রাইতে ওই বেঞ্চে ঘুমাই। দিনে বোতল টোকাই।’ বাড়ি কই? ‘বাড়ি নাই। মা আছে কুমিল্লা। বাপে আরেক বিয়া করার পর মায় কইছে ঢাকা যা। আইসা আর যাই নাই।’
স্কুলে যাও নাই কেন? ‘স্কুলে গেলে বোতল কে টোকাইবো? একদিন গেছিলাম। স্যার কইছে, চুল কাইটা আয়। টাকা নাই তো। আর যাই নাই (হাসে)।’ বোতল বিক্রি করে দিনে কত টাকা হয়? ‘দুইশ থেইকা আড়াইশ টাকা। ১০০ টাকা মায়রে বিকাশ করি। বাকিডি দিয়া খাই।’
স্বপ্ন কী? ‘একটা জুতা কেনা। এই দেহেন, এইডা ছেঁড়া। আর পুলিশ যাতে না মারে। গত হপ্তায় বোতল নিতে গিয়া পুলিশ ধাক্কা দিছে।’ ট্রেনে উঠতে ইচ্ছা করে না? ‘করে।’ মাকে দেখতে যাও? ‘দেখতে মন চায়, একবার মায়রে দেখতে যামু।’
ট্রেনের হুইসেল বাজল। রাব্বি দৌড় দিল সেদিকে। নতুন বোতলের আশায়। তার পায়ের ছেঁড়া জুতাটা পড়ে রইল প্ল্যাটফর্মে, কিন্তু সে খালি পায়েই দৌড়াচ্ছে। আমাদের স্বপ্নগুলো অনেক বড়, ওর স্বপ্নটা শুধু এক জোড়া জুতার।
পৃথিবীর আলো সবার জন্য সমান নয়। কেউ জন্ম নেয় সোনার চামচ মুখে নিয়ে, কেউ জন্ম নেয় রেললাইনের পাশে। যাদের জীবন কষ্টে কাটে, তাদের গল্প কেউ শোনে না। তারা আমাদের পাশেই থাকে— কমলাপুরের টোকাই, ফুটপাতে শুয়ে থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাদের সকাল শুরু হয় ক্ষুধা নিয়ে, রাত শেষ হয় অনিশ্চয়তায়। তাদের কোনো অভিযোগ নেই, শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। মাঝে মাঝে সেসব অদৃশ্য মানুষদের কথা চিন্তা করি। যারা এক জোড়া জুতা আর রাতের খাবার অথবা একটু থাকার জায়গা কিংবা একটু মাকে দেখার স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে এই শহরে— তাদের নাম আমরা কখনো জানি না। তাদের কথাও আমরা শুনি না।



