এবং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সীতাকুণ্ডে আগুনে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং যথারীতি দুর্ঘটনার পর আমাদের বিবেকও কিছুক্ষণের জন্য জেগে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক, প্রশাসনের তদন্তের ঘোষণা, কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন— সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এবার বুঝি নিরাপত্তাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। তবে আমাদের দেশে ‘আমূল পরিবর্তন’ শব্দটির আয়ু সাধারণত একটি সংবাদচক্রের চেয়েও কম।
শ্রমিকরা শিপইয়ার্ডে কাজ করেন জীবন হাতে নিয়ে। লোহা কাটেন, আগুনের সঙ্গে লড়েন, বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি নেন। বিনিময়ে পান মজুরি আর সঙ্গে একটি অদৃশ্য বোনাস, যেটির নাম ‘আজকে বাসায় ফিরতে পারব তো’? কর্মস্থলের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেটি জানতে অবশ্য কোনো শ্রমিকের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা লাগে না; কর্তৃপক্ষ চাইলে দুর্ঘটনার আগেই জানতে পারে। কিন্তু সে কাজটি করতে গেলে তো একটু দায়িত্ব নিতে হয়!
দুর্ঘটনা ঘটার পর অবশ্য দায়িত্বশীলতার অভাব থাকে না। তদন্ত কমিটি হয়, তদন্ত কমিটি আবার তদন্ত করবে, প্রয়োজন হলে আরেকটি কমিটিও হতে পারে। তারপর তদন্ত প্রতিবেদন কোথায় গেল— এ প্রশ্ন করলে সবাই এমনভাবে তাকাবেন, যেন প্রতিবেদনটি প্রাণ হারানো কোনো শ্রমিকের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে!
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমাদের দেশে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। প্রথমে শোক, তারপর ক্ষোভ, এরপর তদন্ত, পরে আশ্বাস এবং সবশেষে নীরবতা। তারপর আরেকটি দুর্ঘটনা। যেন দুর্ঘটনাগুলোও সিরিজ নাটক— একটির শেষ দৃশ্যেই পরেরটির ট্রেলার!
কিন্তু নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে এটি কোনো নাটক নয়। তাদের কাছে আটটি মৃত্যু মানে আটটি ঘর অন্ধকার হয়ে যাওয়া, আটটি পরিবারের স্বপ্ন থেমে যাওয়া। ক্ষতিপূরণের টাকা হয়তো কিছুদিনের অভাব মেটাবে; কিন্তু ফিরিয়ে দিতে পারবে না একজন বাবা, স্বামী, ভাই কিংবা সন্তানের জীবন।
তাই প্রশ্নটা খুবই সাধারণ, শ্রমিকের জীবন কি এতটাই সস্তা যে, নিরাপত্তার চেয়ে তদন্ত কমিটি সস্তা?
সীতাকুণ্ডের আগুন নিভে গেছে। ধোঁয়াও একসময় মিলিয়ে যাবে। সংবাদপত্রের পাতায় নতুন খবর আসবে। কিন্তু আমরা যদি ব্যবস্থা না বদলাই, তাহলে পরবর্তী আগুনের জন্য শুধু জায়গাটাই বদলাবে—শিরোনাম নয়।






