মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ স্মরণ
বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিকের প্রতিষ্ঠাতা

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ
বাংলার সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও মুসলিম সমাজের জাগরণের ইতিহাসে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও সমাজচিন্তক— সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একসময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর। সংবাদপত্রকে তিনি শুধু খবরের কাগজ হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন মানুষকে জাগিয়ে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে। তার জীবন যেন এক দীর্ঘ পথচলা— দুঃখ, সংগ্রাম, স্বপ্ন, রাজনীতি, সাহিত্য আর মানুষের জন্য কাজ করার এক অবিরাম গল্প।
১৮৬৮ সালের ৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে তার জন্ম। বাবা মওলানা আবদুল বারি খাঁ ছিলেন মধ্যবঙ্গের খ্যাতিমান আলেম ও পীর। মা বেগম রাবেয়া খাতুন। ধর্মীয় পরিবেশেই ছোটবেলা কাটছিল আকরম খাঁর। গ্রামের মক্তবে তার শিক্ষার হাতেখড়ি। কিন্তু মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সেই জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। একই দিনে কলেরায় তিনি হারান বাবা ও মাকে। এত অল্প বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে তিনি আশ্রয় নেন নানার কাছে।
এই শোক তাকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং জীবনকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছিল। প্রথমে ইংরেজি স্কুলে পড়লেও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আকর্ষণে তিনি সেই পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ছিলেন বেশ পারদর্শী। মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয় সাংবাদিকতায়। খুব অল্প বয়সেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। আহল-ই-হাদিস ও মোহাম্মদী আখবার পত্রিকায় কাজের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। ১৯০৮ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে তিনি মোহাম্মদী ও আল-এসলাম পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করতে করতেই তিনি উপলব্ধি করেন— একটি সমাজকে বদলাতে হলে মানুষের চিন্তার জগতে আলো জ্বালাতে হবে, আর সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম সংবাদপত্র।
সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি নিজেই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন ‘জামানা’ ও ‘সেবক’। ‘সেবক’ ছিল অসহযোগ ও স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার। সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরার কারণে পত্রিকাটি একসময় নিষিদ্ধ হয় এবং সরকারবিরোধী সম্পাদকীয় লেখার অভিযোগে আকরম খাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু কারাগারও তার কলম থামাতে পারেনি।
রাজনীতির পথেও তার যাত্রা শুরু হয়েছিল অল্প বয়সেই। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রথমদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল একটাই— বাঙালি মুসলমানের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য থেকেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন।
১৯১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় তিনি খিলাফত কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের জন্য অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়।
তার রাজনৈতিক চিন্তায় ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও জায়গা। ১৯২২ সালে তিনি চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিকে সমর্থন করেন এবং ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের পক্ষেও অবস্থান নেন। কিন্তু পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন তাকে গভীরভাবে হতাশ করে। একসময় কংগ্রেস ও স্বরাজ্য পার্টির রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।
এরপর তিনি যুক্ত হন প্রজা বা কৃষক রাজনীতির সঙ্গে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধ ও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ১৯৩৬ সালে তিনি কৃষক রাজনীতি ছেড়ে আবার সক্রিয়ভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের সেন্ট্রাল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি যেন অপেক্ষা করছিল অন্য এক জায়গায়— সংবাদপত্রে। ১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি প্রকাশ করেন দৈনিক ‘আজাদ’। সেই সময় এটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। মুসলিম সমাজের জাগরণ, মানুষের অধিকার, দেশ ও রাজনীতির নানা প্রশ্ন— সবকিছুকে সামনে রেখে ‘আজাদ’ দ্রুতই মানুষের কাছে একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। আকরম খাঁ শুধু পত্রিকা প্রকাশ করেননি; তিনি তৈরি করেছিলেন একটি চিন্তার মঞ্চ।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে তিনি আবার ফিরে আসেন ‘আজাদ’-এর সম্পাদনার দায়িত্বে। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে তিনি পত্রিকাটিকে পরিচালনা করতে থাকেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন। আইয়ুব সরকারের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে ঢাকার সাংবাদিকদের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। বয়স তখন অনেক বেড়েছে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ তখনো ছিল তরুণের মতো দৃঢ়।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যেও তার অবদান অনন্য। বাংলা ভাষার প্রশ্নেও তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। এমন একসময়ে, যখন বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না উর্দু— এ নিয়ে বিতর্ক ছিল প্রবল, তখন আকরম খাঁ দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা।
পরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি বাংলা ভাষার অধিকারের পক্ষে ছিলেন। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তিনি নারী স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন, যা তার চিন্তার আধুনিকতা ও উদারতার পরিচয় বহন করে।
দীর্ঘ জীবনের কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করে।
তার জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল তার বিশ্বাসের মতোই সরল। ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার বংশালে মসজিদে নামাজরত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একটি দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর যেন প্রার্থনার মধ্যেই থেমে গেল তার পথচলা।
লেখক: লেখক ও শিক্ষাবিদ






